পুলিশ, আসামি, দর্শনার্থী বই পড়েন থানা লাইব্রেরিতে

কোতোয়ালি থানা গ্রন্থাগারে বই পড়ছে পুলিশ ও দর্শনার্থীরা
ছবি: গাজী ফিরোজ

চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি মোড়ের পূর্ব দিকসংলগ্ন গেট পেরুলেই কোতোয়ালি থানা ভবন। ঢুকতেই হাতের বাঁ দিকে নিচতলায় ওপরে ওঠার সিঁড়ির নিচে কাচের দরজার একটি কক্ষ। বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে তাকে তাকে সাজানো বই। রয়েছে সুসজ্জিত চেয়ার–টেবিল। সেখানে বসে পড়ছেন থানায় আসা দুজন দর্শনার্থী। তাঁদের একজন মিজান ফারাবী। থানায় এসেছেন এক আত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। এরই ফাঁকে গ্রন্থাগারে ঢুকে পড়েছেন। মিজান ফারাবী স্নাতকোত্তর পাস করে বিভিন্ন চাকরির জন্য আবেদনও করেছেন। গত রোববার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বসে থেকে সময় নষ্ট না করে গ্রন্থাগারে বই পড়ছি। বিভিন্ন ধরনের বই থাকলেও বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে লোকজন যাতে সচেতন হতে পারেন, থানার গ্রন্থাগারে এ ধরনের বই থাকা দরকার।

শুধু কোতোয়ালি নয়, নগরের সব থানায় (১৬ থানা) আছে গ্রন্থাগার। বই পাঠ মানব ভাবনাকে করে পরিশুদ্ধ ও ব্যক্তিত্বকে করে সুস্পষ্ট। বই পড়া বা পাঠাভ্যাসের এ প্রচলন ছড়িয়ে দিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অনন্য উদ্যোগ গ্রন্থাগার চালু। থানায় আসা দর্শনার্থী থেকে শুরু করে আসামি, তাঁদের স্বজন, পড়তে ইচ্ছুক যেকোনো ব্যক্তি এসব গ্রন্থাগারে বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। উপন্যাস, কবিতা, গল্প, আত্মজীবনী, মুক্তিযুদ্ধ, আইন ও ধর্মীয় বই রয়েছে। প্রতিটি গ্রন্থাগারে ৩০০ থেকে ৬০০ বই রয়েছে। থানা ভবন গ্রন্থাগারে বই পড়ার পাশাপাশি চাইলে কেউ বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন বই। তবে ফেরত দিতে হবে।

বাকলিয়া থানাহাজতে বই পড়ছেন আসামি
ছবি: গাজী ফিরোজ

নগরের ১৫টি থানা ভবনে গ্রন্থাগারগুলো চালু করেন নগর পুলিশের সাবেক কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। গত জুলাই মাসে বদলি হয়ে বর্তমানে তিনি কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট নগর পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। সর্বশেষ রোববার নগরের পতেঙ্গা থানা ভবনে চালু হয় গ্রন্থাগার।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় প্রথম আলোকে বলেন, পেশাদারির পাশাপাশি মননশীলতার সুবোধচর্চা পুলিশ সদস্যদের আরও মানবিক করে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি থানায় আসা দর্শনার্থী, আসামিরাও বই পড়ে চিন্তা–চেতনায় এগিয়ে যাবে। গ্রন্থাগারগুলোর জন্য নতুন নতুন বই কেনা হচ্ছে। যেসব থানার গ্রন্থাগারগুলো ছোট, সেগুলো আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কোতোয়ালি থানা ভবনের গ্রন্থাগারটিতে প্রায় ৬০০ বই রয়েছে। এখানে নিয়মিত বই পড়তে যান বলে জানান মো. নাজিম উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সারা দিন ব্যস্ত থাকি। সন্ধ্যার পরে কিংবা রাতে প্রায়ই বই পড়তে যাই। বিশেষ করে আইনের বইগুলো পড়তে তার ভালো লাগে। থানায় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরাও গ্রন্থাগার পেয়ে খুশি। কোতোয়ালি থানার কনস্টেবল জহিরুল হক গত সোমবার দুপুরে থানায় প্রথম আলোকে বলেন, দায়িত্ব শেষ করে এসে রুমে মুঠোফোনে কিংবা আড্ডায় বেশির ভাগ সময় কেটে যেত আগে। এখন থানা ভবনে গ্রন্থাগার চালু হওয়ায় আগের মতো সময় নষ্ট হয় না। অবসর সময়টুকু বই পড়ে কাটে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির প্রথম আলোকে বলেন, দর্শনার্থী, আসামি ও পুলিশ সদস্যদের বই পড়ার আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এ জন্য গ্রন্থাগারে নতুন নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে।

পতেঙ্গা থানা ভবন গ্রন্থাগারে বই পড়ছেন দর্শনার্থীরা
ছবি: গাজী ফিরোজ

নগরের বাকলিয়া থানা ভবনে থাকা গ্রন্থাগার থেকে বই নিয়ে হাজতখানায় থাকা আসামিরা বই পড়েন বলে জানান ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুর রহিম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আসামিরা গ্রন্থাগারে বসে বই পড়ার সুযোগ নেই। কিছু আসামি বই পড়তে চাইলে তাঁদের গ্রন্থাগার থেকে বই দেওয়া হয়। বাকলিয়ার চাক্তাই ভেড়া মার্কেট এলাকার বাসিন্দা মো. শরীফ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকায় গ্রেপ্তার হয়ে থানায় যান। তিনি বলেন, থানাহাজতে বসে সময় কাটছিল না। ঘুম আসতেও দেরি হয়। তাই রাতের বেশির ভাগ সময় তিনি বই পড়ে কাটিয়েছেন।

নগরের খুলশী থানায় ঢুকতেই হাতের ডান পাশে দেয়ালে তাকে তাকে সাজানো বই। পাশে চেয়ারে বসে প্রায়ই বই পড়েন থানায় আসা দর্শনার্থীরা। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় এ থানায় আলাদা কক্ষে গ্রন্থাগার চালু করা হয়নি জানান থানার ওসি সন্তোষ কুমার চাকমা।

সর্বশেষ নগরের শেষ প্রান্তে সমুদ্রসৈকত লাগোয়া পতেঙ্গা থানা ভবনে গ্রন্থাগার চালু হয়। থানা ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে আলমারিতে তাকে তাকে সাজানো বই। সোমবার সেখানে বসে বই পড়ছেন স্থানীয় ডেইল পাড়ার আবু তাহের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, থানায় এসেছিলাম এক আত্মীয়ের মামলার খোঁজ নিতে। তদন্ত কর্মকর্তা বাইরে অভিযানে থাকায় বসে সময় কাটছিল না। এরই মধ্যে এক কনস্টেবল জানালে দোতলায় বসে বই পড়ার সুযোগ রয়েছে। তাই গ্রন্থাগারে ঢুকে গেলাম।

পতেঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মো. নাজমুন নুর প্রথম আলোকে বলেন, জায়গা সংকুলান না হওয়ায় এত দিন করতে সময় লেগেছে। চালুর পর থেকে দর্শনার্থী, পুলিশ সদস্যদের ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

খুলসি থানা গ্রন্থাগারে বই পড়ছেন থানায় আসা দর্শনার্থীরা
ছবি: গাজী ফিরোজ

প্রযুক্তির যুগে বই পড়ার আগ্রহ থেকে মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র চট্টগ্রামের সংগঠক আলেক্স আলীম প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রাম নগর পুলিশের সব থানা ভবনে গ্রন্থাগার চালু খুবই ভালো উদ্যোগ। বইয়ের সংস্পর্শে এসে অপরাধী থেকে শুরু করে দর্শনার্থীদের মধ্যে পরিবর্তন আসবে। অনেকে নিজেদের সংশোধন করে নেবে। রুচির পরিবর্তন হবে, দেখবে নতুন করে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। এটি যাতে বন্ধ হয়ে না যায়।

হাজতখানায় বই পড়ছেন আসামি
ছবি: গাজী ফিরোজ