‘সরকারের বাজেটের তুলনায় ৭৫ কোটি টাকা খুব বেশি নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলছে, তাই এ ধরনের ইভেন্টভিত্তিক আয়োজন কম করে আউটপুটভিত্তিক আয়োজন হওয়া বেশি জরুরি।
ফাহিম মাশরুর, সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)  

গত ২৩ আগস্ট আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদের সভাপতিত্বে একটি সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভার কার্যবিবরণী থেকে চলতি অর্থবছরে আইসিটি বিভাগের  অনুষ্ঠানগুলোর (১৯টি) উদ্দেশ্য, সময়, বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় জানা যায়।

আইসিটি বিভাগের অনুষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজেট বরাদ্দ ধরা হয়েছে ইন্টারন্যাশনাল কলেজিয়েট প্রোগ্রামিং কনটেস্টের (আইসিপিসি) জন্য। এর চূড়ান্ত পর্বের (ওয়ার্ল্ড ফাইনাল) আয়োজক ছিল বাংলাদেশ। ৬ থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় ‘আইসিপিসি ওয়ার্ল্ড ফাইনাল ঢাকা’ শীর্ষক এ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানের জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। অনুষ্ঠানে ৬৯টি দেশের ১৩৭টি দল অংশ নেয়। এতে চ্যাম্পিয়ন হয় যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)।

এদিকে আগামী ৮ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে অনুষ্ঠিত হবে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’। আইসিটি বিভাগ বলছে, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, শেখা ও নেটওয়ার্কিংয়ের সুযোগ করে দেয় ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড। সেখানে ব্যয় হবে ১৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের জন্মদিন উদ্‌যানের জন্য আইসিটি বিভাগ ব্যয় ধরেছে সাত কোটি টাকা।

সাইবার নিরাপত্তা, রোবোটিকস, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইনিং ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করছেন অনেক সরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা ও গবেষক। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), পাঁচজনকে ইউএস বার্কলে এবং পাঁচজানকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ফেলোশিপ’-এর মাধ্যমে পাঠানোর উদ্দেশ্য রয়েছে আইসিটি বিভাগের।

বরাদ্দের অর্থ অনুমোদনের জন্য আইসিটি বিভাগ গত ১৮ সেপ্টেম্বর সরকারের অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছিল। আইসিটি বিভাগ সূত্র বলছে, পুরো অর্থ বরাদ্দের অনুমোদন এখনো পাওয়া যায়নি। কিছু অনুষ্ঠানের জন্য অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বাকিগুলোরও হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে

এ ছাড়া মাইক্রোপ্রসেসর, ন্যানোচিপ ডিজাইনিং অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারিং–বিষয়ক ফেলোশিপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, রোবোটিকসের জন্য জাপান, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জন্য চীনে পাঠানোর চিন্তাভাবনাও করছে আইসিটি বিভাগ। চার কোটি টাকা ব্যয়ে এসব আয়োজনের জন্য স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড, এটুআই, আইসিটি বিভাগ ও হাইটেক পার্ক মিলে একটি সিলেকশন কমিটি গঠন করবে। একটি সরকারি প্রতিনিধিদলও যাবে উল্লিখিত দেশগুলোতে।

জাপানে প্রতিবছর চারবার আইটি সপ্তাহ অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি বিজনেস টু বিজনেস (বিটুবি) প্রদর্শনী অনুষ্ঠান। আগামী বছরের এপ্রিলে জাপান ‘আইটি উইক অটাম’-এ আইসিটি বিভাগ অংশ নেবে। দেশে কীভাবে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা যায়, সেটিও তাদের একটি উদ্দেশ্য থাকবে। হাইটেক পার্কের ব্যবস্থাপনায় এ আয়োজনে অংশ নিতে আইসিটি বিভাগের বরাদ্দ এক কোটি  টাকা। এ ছাড়া এক কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে আগামী মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্লকচেইন অলিম্পিয়াডে।

গত অর্থবছরে লন্ডন ও দুবাইয়ে বিটুবি সেমিনার এবং রোড শোর আয়োজন করেছিল আইসিটি বিভাগ। সেখানে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখেছে আইসিটি বিভাগ। চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুবাই বা লন্ডনে রোড শো ও ব্র্যান্ডিং করতে চায় তারা। এ আয়োজনের জন্য বরাদ্দ এক কোটি টাকা।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ১৬তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হবে। তিন বছর ধরে আইসিটি বিভাগ এ আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। এ বছর ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা।

ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল সরাসরি আইসিটি বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এরপরও কেন পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়, জানতে চাইলে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অ্যানিমেশন ফিল্ম শোকেস করি। এ ছাড়া অ্যানিমেশন, টুডি, থ্রিডিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।’ শিশু–কিশোরদের প্রযুক্তি ও অ্যানিমেশন শিল্পে আগ্রহী করতেই আইসিটি বিভাগ এখানে অংশ নেয় বলে জানান তিনি।

৯ নভেম্বর সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের সব ধরনের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

নারী উদ্যোক্তাদের প্ল্যাটফর্ম উইমেন অ্যান্ড ই-কমার্স (উই) ট্রাস্ট গত ১৪ ও ১৫ অক্টোবর উই সামিট-এর আয়োজন করে। আইসিটি বিভাগ এ আয়োজনের জন্য বরাদ্দ রেখেছিল ২০ লাখ টাকা। নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আরও অনেক সংগঠন থাকার পরও শুধু উইকে নিয়েই কেন সামিট করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী জানান, অন্যান্য সংগঠন নিয়েও তাঁরা আয়োজন করে থাকেন।

এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে কাজ করা আন্তসরকারি ফোরাম কনফারেন্স অন ইন্টারেকশন অ্যান্ড কনফিডেন্স বিল্ডিং মেজরস ইন এশিয়া (সিসা)। চলতি নভেম্বরে  এই ফোরামের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ভার্চ্যুয়াল সেমিনারের আয়োজনের কথা জানিয়েছে আইসিটি বিভাগ। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ লাখ টাকা।

আইসিটি বিভাগ আরও যেসব অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দিয়েছে, সেগুলো হলো আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশ-ভারত স্টার্টআপ এক্সচেঞ্জ অনুষ্ঠান (৯০ লাখ টাকা), গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত রোবট অলিম্পিয়াড (৫০ লাখ টাকা), চ্যানেল আই ডিজিটাল বাংলাদেশ মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড-২০২২ (৫০ লাখ টাকা), মালয়েশিয়ায় গত সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অন আইটি (৫০ লাখ টাকা), বিজয় দিবসের যান্ত্রিক বহরে ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং (৩৫ লাখ টাকা), আগামী ফেব্রুয়ারিতে ন্যাশনাল হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা (৩০ লাখ টাকা), আগামী মার্চে টেক কার্নিভ্যাল (২৫ লাখ টাকা), আগামী জুনে বুয়েটের সঙ্গে সিএসই ফেস্ট (২৫ লাখ টাকা) এবং আগামী ডিসেম্বরে আইসিটি জাম্বুরি (৩০ লাখ টাকা)।

আইসিটি বিভাগের এই ১৯টি আয়োজনের মধ্যে ৫টির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষকে। চারটি করে অনুষ্ঠানের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল ও আইসিটি অধিদপ্তর, দুটি করে অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্বে কন্ট্রোলার অব সার্টিফাইং অথরিটিজ ও আইডিয়া প্রকল্প, একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছে এটুআই। এ ছাড়া অন্য একটি অনুষ্ঠান তিনটি সংস্থা মিলে আয়োজন করবে।

আইসিটি বিভাগের এ অনুষ্ঠান বাজেটে একাধিক বিদেশি আয়োজন ও সফর আছে। যেখানে ডলার ব্যবহার হবে। এদিকে এ বছরের এপ্রিল থেকেই ডলার–সংকট শুরু হয়েছে। কমে আসছে রিজার্ভ। গত মে মাসে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ সীমিত করার বিষয়ে একাধিক আদেশ জারি করেছিল সরকার। আবার ৯ নভেম্বর সরকারের পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের আওতায় সরকারি কর্মকর্তাদের সব ধরনের বিদেশ ভ্রমণ বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়।

আইসিটি বিভাগের এসব আয়োজন সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ও বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের বাজেটের তুলনায় ৭৫ কোটি টাকা খুব বেশি নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলছে, তাই এ ধরনের ইভেন্টভিত্তিক আয়োজন কম করে আউটপুটভিত্তিক আয়োজন হওয়া বেশি জরুরি।’

ফাহিম মাশরুর আরও বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দুই ধরনের উদ্দেশ্য থাকে—সচেতনতা তৈরি ও প্রভাব তৈরি করা। সচেতনতা তৈরিতে সরকারের খরচ বেশি দেখা যায়। সচেতনতা যথেষ্ট তৈরি হয়েছে। সত্যিকারের প্রভাবের ওপর এখন মনোযোগ দেওয়া উচিত। সে জায়গাতে যদি সরকার খরচ করতে চায়, তাতে আপত্তি নেই। তবে সচেতনতার দিক থেকে বাজেট কমানো উচিত।’