পল্লিতে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু রোধে যে প্রকল্প দেখাচ্ছে আশা
সামারি বাংলাদেশে ১–৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর সবচেয়ে বড় কারণ পানিতে ডোবা। ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায় চালু দিবাযত্ন কেন্দ্রভিত্তিক প্রকল্পের মূল্যায়নে দেখা গেছে, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত নিরাপদ তত্ত্বাবধান শিশুদের ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে।
বাংলাদেশের গ্রামে পুকুর শুধু পানির উৎস নয়; জীবনযাপনের অংশ। ঘরের পাশে পুকুর, উঠানের ধারে ডোবা, বাড়ির পেছনে খাল—সব মিলিয়ে শিশুর বেড়ে ওঠা যেন পানির সঙ্গে সহাবস্থানের গল্প। কিন্তু এই চেনা পানিই অনেক সময় হয়ে ওঠে বড় শোকের কারণ।
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বৈঠাখাই গ্রামের দুপুরটা যেমন। বাড়ির আঙিনায় খেলছিল দুই শিশুকন্যা—রুমা আক্তার ও পাপিয়া আক্তার। পরিবারের সদস্যরা ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের কাজে। একসময় শিশু দুটি সবার অগোচরে বাড়ির পাশের পুকুর পাড়ে চলে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পুকুর থেকে তাদের অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানান, দুই শিশুই মারা গেছে।
নওগাঁর পোরশায়ও একই ধরনের ঘটনা। আড়াই বছরের আবরার ফাহাদ বাড়ির পাশে খেলছিল। পরিবারের সদস্যদের অজান্তে পুকুরে পড়ে যায় সে। পরে পানিতে ভাসমান অবস্থায় তাকে পাওয়া যায়। একই ঘটনায় আরেক শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও বাঁচানো যায়নি ফাহাদকে।
বাংলাদেশে এমন ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে। এই বাস্তবতার মধ্যেই মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি বাস্তবায়ন করেছে ‘ইন্টিগ্রেটেড কমিউনিটি-বেইজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেফ ফ্যাসিলিটিজ (আইসিবিসি)’ প্রকল্প। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটি চলে ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায়। ৮ হাজার ২০টি সমাজভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে ১–৫ বছর বয়সী ২ লাখ ৫০০ শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল এই প্রকল্পে।
দেশের ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এখন পানিতে ডোবা। এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে পানিতে ডুবে। বছরে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় ১৯ হাজারের বেশি মানুষের, যাদের বড় অংশই গ্রামীণ এলাকার শিশু।
দেশের ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ এখন পানিতে ডোবা। বাংলাদেশ হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে ২০১৬–এর তথ্য উদ্ধৃত করে আইসিবিসি প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বয়সী শিশুদের মৃত্যুর ৪৩ শতাংশই ঘটে পানিতে ডুবে। বছরে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় ১৯ হাজারের বেশি মানুষের, যাদের বড় অংশই গ্রামীণ এলাকার শিশু।
পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু এই প্রকল্পের মাধ্যমে অনেকটা কমিয়ে আনা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে শুধু এই প্রকল্পের মধ্যে থেকে নয়, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধকে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে, এমন মতও রয়েছে।
সকালটাই ঝুঁকির, মনোযোগ তাই সেখানে
গ্রামীণ জীবনে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়টি শিশুদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় মা–বাবা বা অভিভাবকেরা ঘরের কাজ, কৃষিকাজ, বাজার, রান্না বা জীবিকার কাজে ব্যস্ত থাকেন। ছোট শিশুরা তখন অনেক সময় একা বা বড় ভাই–বোনের তত্ত্বাবধানে থাকে। ঘরের পাশেই যদি পুকুর বা ডোবা থাকে, কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই যথেষ্ট। আইসিবিসি মডেল এই ঝুঁকির সময়টিতেই মনোযোগ দিয়েছে। প্রতিটি শিশুযত্ন কেন্দ্র সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে। সেখানে শিশুদের খেলাধুলা, গল্প বলা, সৃজনশীল কাজ ও দলভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা থাকে। প্রতিটি কেন্দ্রের লক্ষ্য ২৫ শিশুকে নিরাপদ পরিবেশে রাখা।
সাফল্য কতটা
দাবি করা হচ্ছে, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় শিশুদের কারও পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। কারণ দিনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে তারা ছিল নিবিড় নজরদারির মধ্যে।
আইসিবিসি প্রকল্পের প্রথম পর্যায় চলে ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৬ জেলার ৪৫ উপজেলায়। ৮ হাজার ২০টি সমাজভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে ১–৫ বছর বয়সী ২ লাখ ৫০০ শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল এই প্রকল্পে।
যেসব বেসরকারি সংগঠন এ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে কাজ করেছে, তাদের মধ্যে আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থা (আউস) এবং টিএমএসএসের সঙ্গে কথা হয়েছে। আউসের নির্বাহী পরিচালক মাসুদ পারভেজ জানান, নেত্রকোনা, বরগুনা ও সুনামগঞ্জে তাঁদের প্রতিষ্ঠান কাজ করে। সেখানে ২৫ হাজার শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে ছিল। এসব শিশুর মধ্যে চারটি শিশু মারা গেছে, কিন্তু তারা দিবাযত্ন কেন্দ্রে থাকার সময় নয়। অন্য সময়ে মারা যায়। টিএমএসএস কাজ করে ময়মনসিংহ, শেরপুর ও পটুয়াখালী জেলায়। তাদের কেন্দ্রগুলোতেও ২৫ হাজার শিশু ছিল বলে জানান প্রকল্পটির সেন্ট্রাল কো–অর্ডিনেটর মুশফিকুর রহমান। তিনি জানান, কেন্দ্রে থাকা একটি শিশুরও মৃত্যুর ঘটনা নেই।
শুধু পাহারা নয়, শেখাও। প্রকল্পটি শুধু শিশুকে ঘরে আটকে রাখার ব্যবস্থা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রারম্ভিক শৈশব বিকাশ, খেলাভিত্তিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি, অভিভাবক সচেতনতা ও শিশু সুরক্ষা।
ব্র্যাক আইইডির (ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধীনে পরিচালিত ইনস্টিটিউট) এক মূল্যায়নে দেখা যায়, আইসিবিসি কেন্দ্রে থাকা শিশুরা যোগাযোগ, শোনার দক্ষতা, সমস্যা সমাধান এবং ব্যক্তিগত-সামাজিক বিকাশে তুলনামূলক ভালো ফল করছে।
এতে শুধু শিশুরাই নয়, উপকৃত হয়েছেন মায়েরাও। গবেষণায় দেখা গেছে, নিরাপদ শিশুযত্ন কেন্দ্র থাকায় অনেক মা এখন দুশ্চিন্তামুক্তভাবে কাজ করতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারে এটি মানসিক স্বস্তি তৈরি করেছে।
প্রতিটি শিশুযত্ন কেন্দ্র সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলে। সেখানে শিশুদের খেলাধুলা, গল্প বলা, সৃজনশীল কাজ ও দলভিত্তিক শেখার ব্যবস্থা থাকে। রয়েছে সাঁতার শেখানোরও ব্যবস্থা।
এ ছাড়া ৬–১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ছিল সাঁতার শেখানোর ব্যবস্থা। প্রকল্পের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩ লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখাতে ৮০০টি সুইম-সেফ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।
তৈরি হচ্ছে স্কুলে যাওয়ার পথও আইসিবিসি কেন্দ্র থেকে ৫ বছর বয়সে ৪৮ হাজার ৪৯ শিশু প্রাক্-প্রাথমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে মেয়েশিশু ৫১ শতাংশ, ছেলেশিশু ৪৯ শতাংশ; অর্থাৎ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র শিশুদের স্কুলে যাওয়ার পথও তৈরি করেছে।
প্রকল্পের আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কেন্দ্র থেকে বের হওয়া শিশুদের ৭০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ১৫ শতাংশ মাদ্রাসায়, ১০ শতাংশ কিন্ডারগার্টেনে এবং ৫ শতাংশ অন্য পথে গেছে বা কোথাও ভর্তি হয়নি।
সাফল্যের পাশাপাশি কিছু দুর্বলতাও চিহ্নিত হয়েছে মূল্যায়নে। তাতে দেখা গেছে, পর্যবেক্ষণ করা ৪০২টি শিশুযত্ন কেন্দ্রের ৯৬ শতাংশ চালু থাকলেও মাত্র ১৩ শতাংশ কেন্দ্রে ন্যূনতম ২৫০ বর্গফুট জায়গা ছিল। ফার্স্ট এইড বক্স ছিল মাত্র ১৪ শতাংশ কেন্দ্রে।
সাঁতার কেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও অসমতা ছিল। ৮১টি পর্যবেক্ষণ করা সাঁতার কেন্দ্রের মধ্যে ৮৫ শতাংশে পুকুরপাড়ে পূর্ণ বেড়া ছিল, কিন্তু ১০ শতাংশে কোনো বেড়া ছিল না। ৪৭ শতাংশ কেন্দ্রে ভেসে থাকার উপকরণ ছিল না।
মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন
শিশু মৃত্যুরোধে প্রকল্পটি শিশু একাডেমি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে। এ প্রসঙ্গে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকল্পটির সফলতার কথা শুনেছি। কিন্তু এর প্রভাব নিয়ে খুব যথার্থ মূল্যায়ন দেখিনি। তবে তাদের মূল্যায়নকে আমি সরল বিশ্বাসে গ্রহণ করেছি।’
বেসরকারি সংগঠন পরিচালিত দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুদের ডুবে মৃত্যু রোধে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, সেটি নিয়ে আরও বিশ্লেষণ দরকার বলে মনে করেন দুর্যোগবিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যেসব এলাকায় সাফল্য দাবি করা হচ্ছে, সেখানে আগে ডুবে মৃত্যুর তথ্যের সঙ্গে তুলনা করতে হবে। আর এই কেন্দ্রগুলোতে যেভাবে কর্মকাণ্ড পরিচালনা হয়েছে, সেখানে সুফল পাওয়া যায় সাময়িকভাবে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের কেরালার উদাহরণ দিয়ে গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, কেরালার মতো অঙ্গনবাড়ি করে সেখানে মায়েদের দিবাযত্ন কেন্দ্রের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। একেকজন মা একেক দিন শিশুদের দেখভাল করার দায়িত্ব পাবেন। আসলে প্রকল্পের মধ্যে থেকে নয়, ডুবে মৃত্যু রোধকে একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে।
শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুরোধে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী কাউন্সিলর আছেন, তাঁদের এ–সংক্রান্ত বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। ডুবে মৃত্যু রোধ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বের অংশ করা হোক। তাদের কর্মপরিধির মধ্যে এগুলোকে রাখা দরকার।
দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি
প্রকল্পের প্রথম পর্যায় দেখিয়েছে, ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে বড় প্রযুক্তি নয়, দরকার স্থানীয়, কম খরচের, নিয়মিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা। শিশুকে দিনের ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে নিরাপদ কেন্দ্রে রাখা, অভিভাবককে সচেতন করা এবং বড় শিশুদের সাঁতার শেখানো—এই তিন কাজ একসঙ্গে হলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।
প্রকল্পটির প্রথম পর্যায় শেষ হয়েছে। এখন দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর কথা বললেন প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম অংশীদার সিনারগোস বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ রিজওয়ানুল হক খান। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থাটি শিশু মৃত্যু ঠেকাতে কাজ করে আসছে। রিজওয়ানুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মডেলটি শিশুদের জীবন বাঁচাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তাই এটি বন্ধ হলে শিশুরা আবারও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পটির গুরুত্ব বিবেচনায় দ্বিতীয় পর্যায় এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমরা। আমরা এ প্রকল্প বাদ দিইনি। তবে এর তদারকি আরও যথার্থ হওয়া দরকার। সেই ব্যবস্থা রাখা হবে বলে আশা করি।’
‘আরও শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ’ দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে মোহাম্মদ রিজওয়ানুল হক খান বলেন, প্রথম পর্যায়ের মূল্যায়নে যে ক্ষেত্রগুলোতে উন্নতির সুযোগ চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোকে আগামী দিনের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের সোপান হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। আগের প্রকল্পের কিছু সীমাবদ্ধতার কথা বিভিন্ন মূল্যায়নেও এসেছে। এখন ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।