নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে টাস্কফোর্স ঘোষণার দাবি

‘দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, হত্যা, সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদে’ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত সমাবেশ
ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেছেন, নতুন সরকার ৬ মাসের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করলেও সেখানে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের কোনো কর্মসূচি নেই। নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে, শূন্য সহিংসতার নীতি অনুসরণ করে অবিলম্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে একটা টাস্কফোর্স ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

আজ সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এ দাবি জানান ফওজিয়া মোসলেম। ‘দেশব্যাপী ক্রমবর্ধমান নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণ, হত্যা, সহিংসতার ঘটনার প্রতিবাদে’ এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আয়োজক বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

ফওজিয়া মোসলেম তাঁর বক্তব্যে নরসিংদীতে ধর্ষণের পর কিশোরীকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার বিচার না হওয়ার পুরোনো সংস্কৃতি চলছে। এই সংস্কৃতি দেশকে একটা ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার পরিস্থিতি তুলে ধরেন ফওজিয়া মোসলেম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে। এই স্বল্প সময় ইঙ্গিত করছে, আমাদের আগামী দিনগুলো কেমন হবে।’

ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ধর্ষণ একটা ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি অপরাধের বিচার কোনো সালিসে হতে পারে না। তাই ধর্ষণের বিচার কোনো সালিসে হতে পারে না। এটা বেআইনি। এই বেআইনি কাজ সমাজে যাঁরা ক্ষমতাসীন লোক আছেন, তাঁরা ফৌজদারি আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে করে যাচ্ছেন।

১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসবে। সেই অধিবেশন যাতে শুধু স্পিকার, হুইপ নির্বাচনের মতো আনুষ্ঠানিকতায়, বড় বড় বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে আহ্বান জানান ফওজিয়া মোসলেম। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সংসদে যাতে তৎপরতা থাকে, সেই আহ্বান জানান তিনি।

প্রতিদিন নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতি যে নৃশংসতা হচ্ছে, তার জন্য মহিলা পরিষদ ক্ষুব্ধ বলে মন্তব্য করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। তিনি বলেন, দেশে এক সরকার গেলে অন্য সরকার আসে। ক্ষমতার পরিবর্তন হয়। কিন্তু নারীর প্রতি সহিংসতার বিচার কখনো নিশ্চিত হয় না। সহিংসতার বিচার করার মতো কোনো কাঠামো কেউ প্রতিষ্ঠা করে না। কারণ, নারীকে মর্যাদা দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারেনি।

মালেকা বানু মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে এখনো নারীকে ভোগের পণ্য ও প্রজননযন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।

মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, নারীর প্রতি সমাজের ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গির এখনো পরিবর্তন হয়নি। নারীর প্রতি যখন কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তখন শুধু নারীরাই রাস্তায় নামেন, প্রতিবাদ করেন। সমাজের অন্য কোনো বিবেকবান মানুষ এই প্রতিবাদে অংশ নেন না। সমাজের বিবেকবান পুরুষেরা নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে কী ভূমিকা রাখছেন, সেই প্রশ্ন রাখেন তিনি।

সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বলেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও নারীদের রাস্তায় দাঁড়াতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি দুঃখজনক। তিনি সরকারের কাছে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান। পাশাপাশি প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতের দাবি জানান।

প্রতিবাদ সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের নেত্রী পারভীন ইসলাম, শামীমা আফরোজ, রেখা সাহা, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ। প্রতিবাদ সমাবেশ শেষ নারীরা ‘নারীর অধিকার, মানবাধিকার’, ‘সহিংসতার বিরুদ্ধে, রুখে দাঁড়াও একসাথে’, ‘নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে, রুখে দাঁড়াও একসাথে’, ‘সম্মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলো, গড়ে তোলো’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।

প্রতিবাদ সমাবেশ সঞ্চালনা করেন মহিলা পরিষদের লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড লবি পরিচালক দীপ্তি শিকদার। তিনি বলেন, কন্যাশিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বাড়ছে। অনেক ঘটনা গণমাধ্যমেও আসে না। তিনি সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান, তারা যাতে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে দ্রুত উদ্যোগ নেয়।