২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে গঠিত এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন দেশে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ভোটে ইভিএমের ব্যবহার শুরু করে। তবে এ যন্ত্রে ভোট নেওয়ার ওপর মূলত জোর দেয় কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বিদায়ী নির্বাচন কমিশন। তবে শুরু থেকেই এ যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, সন্দেহ, অবিশ্বাস ছিল।

দিন দিন সে বিতর্ক আরও বাড়ছে। এত দিন বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর অবস্থান ছিল ইভিএমের বিপক্ষে। এখন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও (জাপা) ইভিএমের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত জুন মাসে ইসির সঙ্গে মতবিনিময়ে ইভিএমের বিপক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছে জাপা। যদিও ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইভিএম প্রশ্নে দলটি প্রকাশ্যে ইভিএমের বিরোধিতা করেনি। এমনকি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলও ইভিএম নিয়ে তাদের সংশয়ের কথা বলছে এখন।

default-image

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৭ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করেছিল নূরুল হুদা কমিশন। তখন আলোচনায় ইভিএম ব্যবহারের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছিল। সে সময় সংলাপে ৩৯টি দলের মধ্যে ২৩টি ইভিএম নিয়ে তাদের মতামত দিয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপিসহ ১২টি দল ছিল ইভিএমের বিপক্ষে। আর আওয়ামী
লীগসহ ১১টি দল ছিল পক্ষে। পক্ষে থাকা দলগুলোর মধ্যেও কয়েকটি দল পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছিল। শেষ পর্যন্ত গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়। তবে সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনে ব্যাপকভাবে এ যন্ত্রের ব্যবহার অব্যাহত রাখা হয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর তারাও ভোটে ইভিএমের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। তবে এ যন্ত্র নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সন্দেহ দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান কমিশন। এ জন্য ৩৯টি দলকে জুন মাসে ইসিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

এর মধ্যে বিএনপিসহ ১১টি দল ইসির আহ্বানে সাড়া দেয়নি। যে ২৮টি দল ইসির আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছে, তারা আলোচনায় ইভিএমের কারিগরি দিক পর্যালোচনার চেয়ে রাজনৈতিক দিককেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। জুন মাসে অনুষ্ঠিত ইসির ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দল ও গণতন্ত্রী পার্টি—এ চার দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট চেয়েছে। এ ছাড়া তরীকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টি (জেপি), বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বিএনএফ, জাকের পার্টি ও এনপিপি কিছু আপত্তি সত্ত্বেও ইভিএমের পক্ষে বলেছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনকে ত্রুটিমুক্ত করতে তাঁরা ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে। বাকি সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের।

ইভিএম নিয়ে ইসির মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যায়নি বিএনপি, সিপিবি, বাসদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। এসব দল সরাসরি ইভিএমের বিপক্ষে বক্তব্য দিচ্ছে।

শুরু থেকেই ইভিএমের ঘোরতর বিরোধিতা করে আসছে রাজনীতির মাঠে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। তারা বলে আসছে, এ যন্ত্র নীরবে ভোট চুরির যন্ত্র। এখন দলটি বলছে, তারা ইসি নিয়েই কথা বলতে আগ্রহী নয়। ইসি নিয়ে তাদের আস্থা নেই। তাদের মূল দাবি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন।

ইসির মতবিনিময়ে জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাপাসহ ১৮টি দল ইভিএম নিয়ে সন্দেহ-সংশয়ের পাশাপাশি নানা প্রশ্ন তুলেছে। মানুষের আস্থা না থাকা, ভোট দিতে দেরি হওয়া, অনেকের আঙুলের ছাপ না মেলা—এসব কারণে জাপা ইভিএমের বিরোধী বলে জানান দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক।

ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান ও ইসির ভাবনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান প্রথম আলোকে বলেন, সন্দেহ দূর করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তাঁরা। তবে দু–একটি দল ছাড়া কেউ বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসেনি, ভালোমতো যন্ত্রটি (ইভিএম) দেখেওনি। তারা হয়তো বিরোধিতা করার জন্যই ইভিএমের বিরোধিতা করছে। তবে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের যেসব নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার করা হয়েছে, সেসব মূলত শহর এলাকা। সেখানেও ভোট দিতে গিয়ে নানা ঝামেলায় পড়তে হয় ভোটারদের। বিশেষ করে নারী ও বয়স্ক ভোটাররা ইভিএম ব্যবহারে স্বচ্ছন্দ ছিলেন না। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম ঠিকমতো কাজ করেনি। ভোটের পর পরাজিত মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকার অভিযোগ করেছিলেন, ইভিএম ‘জালিয়াতির বাক্স’।

গত মাসে ইসিকে দেওয়া এক চিঠিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) বলেছে, ইভিএম এখনো বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেনি। অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএমে ভোটদান পদ্ধতির বিরোধিতা করেছে। তাই আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।

তবে বিতর্ক থাকলেও নির্বাচন কমিশন আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করতে চায় এবং সেভাবেই এগোচ্ছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন নানাভাবে ইভিএমের যৌক্তিকতা দেখাতে চাইছে। যদিও ইভিএমে জালিয়াতি করা সম্ভব বলেই মানুষ মনে করে। ফলে এ যন্ত্র ব্যবহার করা হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন