জুলাইয়ের মতো এত বড় একটি অভ্যুত্থানের পরও সবকিছু সেই পুরোনো কায়দাতেই চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) সহ-উপাচার্য সাঈদ ফেরদৌস। অন্তর্বর্তী সরকার পুরোনো ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে বলেও তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, ‘আমরা নাম দিয়েছি নতুন বন্দোবস্ত, করেছি পুরোনো বন্দোবস্ত।’
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনে ‘আগামী নির্বাচিত সরকার ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল সংলাপে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সাঈদ ফেরদৌস। এই গোলটেবিলের আয়োজক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)। সংলাপে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আমরা নাম দিয়েছি নতুন বন্দোবস্ত, করেছি পুরোনো বন্দোবস্ত
সংলাপে অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের (২০২৪ সালের ৫ আগস্ট) পর আমলাতন্ত্রে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানে পদ-পদবি ভাগাভাগি হয়েছে সেই পুরোনো বন্দোবস্তের মতো করেই। এত বড় অভ্যুত্থানের পর, এত রক্তপাতের পর, গুম-খুনের পরও সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের গায়ে টোকাও পড়েনি। তাঁর মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নাম দিয়ে সবচেয়ে বেশি বর্জনমূলক রাজনীতি এই সময়ে হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না উল্লেখ করে অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, একটি প্রবল শক্তিশালী মত ভিন্নমতগুলোকে থামিয়ে দিচ্ছে—এমন চেষ্টা দেখা গেছে। বল প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। শ্রেণিগতভাবে, জাতিগতভাবে প্রান্তিক মানুষদের কোণঠাসা হতে দেখা গেছে। মার খেতে, রক্তাক্ত হতে দেখা গেছে। এসব বিষয়ে এই সরকারকে খুবই নিষ্ক্রিয় মনে হয়েছে।
‘দঙ্গলবাজি’
গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে দেশে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া এবং আগামী সরকারের কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশার বিষয়গুলোও সংলাপে উঠে এসেছে।
সামাজিক অস্থিরতার কারণ হিসেবে সংলাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, পরাজিত শক্তিগুলো চায় না রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের কোনো সামাজিক চুক্তি হোক। এ জন্য প্রথমে ভুয়া তথ্য, অপতথ্য ও বয়ানের বাজার তৈরি করেছিল পরাজিত শক্তিগুলো। এ কাজে যখন তারা ব্যর্থ হলো, তখন শুরু করল ‘দঙ্গলবাজি’। তবে এ ক্ষেত্রেও তারা (অপশক্তি) পরাজিত হবে বলে মনে করেন তিনি।
নারীদের হয়রানি
অনলাইনে নারীদের ওপরে চলমান হয়রানির বিষয়টি তুলে ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, মানুষের কথা বলার বা জবানের অধিকারের জন্য যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই জায়গাতেই আক্রমণ হচ্ছে। এই আক্রমণের সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য হচ্ছেন নারীরা, বিশেষ করে যাঁরা জনপরিসরে রাজনৈতিক মতামত দিচ্ছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে অনেক ফেসবুক পোস্ট ‘অনলি মি’ (অন্য কেউ এই পোস্ট দেখতে পারবে না) করে রাখতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানান সামিনা লুৎফা।
মানুষের কথা বলার বা জবানের অধিকারের জন্য যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল, সেই জায়গাতেই আক্রমণ হচ্ছে
আগামী সরকারের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘আমরা আশা করি, যে প্রাণের বিনিময়ে আজকে এই নতুন নির্বাচন হতে যাচ্ছে, নির্বাচিত সরকার দেশে আসতে যাচ্ছে, সেই সরকার যেন জনগণের প্রত্যাশাকে পদদলিত না করে।’
‘পপুলার ফ্যাসিজম’
গত দেড় বছরে অন্তর্বর্তী সরকার ‘পপুলার ফ্যাসিজম’–এর ভিত গড়েছে বলে সংলাপে মন্তব্য করেন অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার আমলে যে ‘স্টেট ফ্যাসিজম’ ছিল, সেটাকে ‘পপুলার ফ্যাসিজমে’ রূপান্তর করা হয়েছে। এই সরকার অদক্ষ ও অলস আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।
জিয়া হাসান বলেন, ‘যদি আপনি সত্য কথা বলতে চান...আপনাকে ক্রমাগত চরম আক্রমণের মধ্যে পড়তে হবে।’
আগামী দিনে যারা ক্ষমতায় যেতে চায়, ‘মব’ বা দঙ্গলবাজদের বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে সংলাপে আহ্বান জানান লেখক ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক হামলা, দঙ্গলবাজি করে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে চায়—এমন সরকার যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে স্থায়ী সংকট তৈরি হবে।
এমন একটা সমাজ তৈরি করতে হবে, যেখানে সবার জন্য জায়গা থাকবে। সবার দম নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হবে
‘সবার দম নেওয়ার সুযোগ’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, ভাঙা রাষ্ট্রব্যবস্থা মেরামত করা আগামী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র কার্যকর করতে ভীষণ শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্র যেন নিয়ন্ত্রণহীন না হয়, সে জন্য সিভিল সোসাইটির (নাগরিক সমাজ) ভূমিকা থাকতে হবে। তবে তিনি এটিও বলেছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সিভিল সোসাইটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর-আল-মতিন বলেন, দেশের কোটি কোটি মানুষের ভোট নিয়ে, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আগামী সরকার ক্ষমতায় আসবে। ফলে তাদের এমন একটা সমাজ তৈরি করতে হবে, যেখানে সবার জন্য জায়গা থাকবে। সবার দম নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত হবে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী, সাংবাদিক চিন্ময় মুৎসুদ্দী, লেখক ও সংগঠক নাহিদ হাসান প্রমুখ। সংলাপের সঞ্চালক ছিলেন ব্রেইনের নির্বাহী পরিচালক শফিকুর রহমান।