লন্ডনে প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময়
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না: মাহফুজ আনাম
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অঙ্গীকারের ওপর দেশের অগ্রগতি নির্ভর করছে বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাই, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।’
যুক্তরাজ্যের লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে গতকাল রোববার আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় মাহফুজ আনাম এ কথা বলেন।
দেশের বাইরে বসবাসকারী পাঠকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্যে লন্ডনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে দ্য ডেইলি স্টার। অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে সম্পাদক মাহফুজ আনাম দেশে–বিদেশে বসবাসকারী পাঠকদের আরও ভালোভাবে সেবা দিতে কী করা যায়, সে বিষয়ে খোলামেলা মতামত, পরামর্শ আহ্বান করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে দ্য ডেইলি স্টার–এর ৩৫ বছরের পথচলা নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এতে স্বাধীন সাংবাদিকতার প্রতি দ্য ডেইলি স্টার–এর অঙ্গীকার, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকাটির বিকাশ তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা–অগ্নিসংযোগের ঘটনাও উঠে আসে প্রামাণ্যচিত্রে। এ ছাড়া সংবাদমাধ্যমের সামনে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জসহ তা মোকাবিলায় পত্রিকাটির দৃঢ় অবস্থান প্রামাণ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মাহফুজ আনাম বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে নিয়মিত, দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ গড়ে তোলার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই আয়োজন। দ্য ডেইলি স্টার পরিবর্তিত হচ্ছে। ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা এই পত্রিকার বৈশ্বিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করতে চান। প্রাণবন্ত বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের কারণে এই সংলাপ শুরুর জন্য লন্ডনই সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা।
মাহফুজ আনাম বলেন, পাঠকদের প্রত্যাশা ও পরামর্শ সরাসরি জানার মাধ্যমে ভবিষ্যতে পত্রিকার সম্পাদকীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যাবে। তিনি চান, এই সংলাপ নিয়মিত হোক, যাতে পাঠকদের অভিজ্ঞতা–মতামত দ্য ডেইলি স্টার–এর সাংবাদিকতায় প্রতিফলিত হয়।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের সাফল্য, অর্জনের গল্প আরও বেশি করে দ্য ডেইলি স্টার তুলে ধরতে চায় বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাতে এই গল্পগুলো বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।
আলোচনা পর্বে অংশগ্রহণকারীরা সংবাদপত্রটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, প্রবাসীদের প্রতিনিধিত্ব ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
একজন অংশগ্রহণকারী বলেন, ইংরেজি ভাষার সংবাদপত্র হওয়ায় দ্য ডেইলি স্টারকে অনেক সময় তুলনামূলকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির পত্রিকা হিসেবে দেখা হয়। জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার ওপর এখন আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁরা দেশের মানুষের বাস্তব জীবনের বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে চান। কৃষক, গ্রামীণ নারী ও শ্রমজীবী মানুষের অবদান অপরিসীম। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁদের কণ্ঠস্বর আরও বেশি তুলে ধরা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা কীভাবে বজায় রাখা হয়—এমন প্রশ্ন করা হয়। জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক না কেন, দ্য ডেইলি স্টার সব সময় তার সাংবাদিকতার নীতির প্রতি অটল থেকেছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতি নিয়ে তাঁরা বহু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। দ্য ডেইলি স্টার–এর দায়িত্ব, মূলমন্ত্র হলো—নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা অক্ষুণ্ন রাখা।
বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংবাদ প্রকাশে কোনো প্রভাব পড়ে কি না—এমন প্রশ্ন করা হয়। জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, যদি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ থাকে, আর তা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে তা প্রকাশ করা তাঁদের দায়িত্ব। বাণিজ্যিক স্বার্থ কখনো সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে না।
‘ভারতের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী’ পত্রিকা বলে যে অভিযোগ মাঝে মাঝে উত্থাপিত হয়, সে বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘যারা এ ধরনের অভিযোগ করেন, তাঁরা কখনো কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। কেউ এ অভিযোগ করলে তাঁকে বলুন, তথ্য-প্রমাণসহ তা উপস্থাপন করতে।’
সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে এবং বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ন্যায়সংগত–ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের পক্ষে দ্য ডেইলি স্টার ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদনসহ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে আসছে বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা মামলা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে কথা বলেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার ভেতরে দুর্নীতি থাকলে তার শাস্তি হওয়া উচিত। তবে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও জরুরি। কোনো সাংবাদিক দুর্নীতিতে জড়িত প্রমাণিত হলে অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া গুরুতর অভিযোগে মাসের পর মাস সাংবাদিকদের কারাগারে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে মাহফুজ আনাম বলেন, দেশের অগ্রগতি নির্ভর করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অঙ্গীকারের ওপর।
দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘আমরা যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চাই, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না।’
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের কথা স্মরণ করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, আজও দেশের প্রতি তাঁদের দায়িত্ববোধ ও আবেগ সমানভাবে শক্তিশালী। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করেন, আজও তাঁরা বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে আগ্রহী। সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন সাংবাদিকতায় দেখতে চান তিনি।
অনুষ্ঠানের শেষে অংশগ্রহণকারীরা সরাসরি সম্পাদকের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ পাওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দ্য ডেইলি স্টার–এর যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি বুলবুল হাসান।