ফুটপাতে রুটি, ডাল, ডিমভাজি ও সবজি বিক্রি করে সংসার চলে মো. হোসেনের। প্রতিদিন সকাল সাতটার মধ্যে তিনি চলে আসেন কারওয়ান বাজারে টিসিবি ভবনের সামনের ফুটপাতে। দুটি লম্বা টেবিল ও কয়েকটি চেয়ার বিছিয়ে শুরু করেন বিক্রির প্রস্তুতি। রুটি ও ডিমভাজি ফুটপাতে বসেই তৈরি করেন এলপিজি সিলিন্ডারের চুলায়। ডাল ও সবজি বাসা থেকে তৈরি করে আনেন।
৫০ পেরোনো হোসেনের দোকানে যাঁরা খেতে আসেন, তাঁদের বড় অংশই শ্রমজীবীসহ সীমিত আয়ের মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তখন দোকানে ক্রেতা ছিল না। দুপুরের দিকে এ রকম অবস্থা আগে কখনো হতো না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বেচাবিক্রির অবস্থা সুবিধার না। জিনিসপত্রের দাম যেমনে বাড়তেছে, রুটি–ডিমভাজি বেইচা কয় টাকা লাভ?’
১৫ বছর ধরে সকাল–সন্ধ্যা ফুটপাতে রুটি বিক্রি করেই সংসার চলে হোসেনের। তিনি বলেন, ‘আগে দিনে তিন হাজার, সাড়ে তিন হাজারও (টাকা) বেচতাম। এখন আড়াই হাজারও পার হয় না। খরচ বাদ দিয়া ছয়–সাত শর বেশি থাকে না।’
তেল, আটা, ডিম, পেঁয়াজ, সবজি, গ্যাস—সবকিছুর দাম বাড়তি। এরপরও রুটির দাম বাড়ানোর সাহস করতে পারছেন না বলে জানান এই বিক্রেতা। তাঁর আশঙ্কা, ‘দাম বাড়াইলে খাইব না মানুষ।’
ফুটপাতের এই দোকানে রুটির দাম ১০ টাকা। ডিমভাজি ২০ টাকা। ডাল–সবজি প্রতি প্লেট ১০ টাকা।
মগবাজারের গাবতলায় দুই কক্ষের একটি আধা পাকা ঘরে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন খাবার বিক্রেতা হোসেন। ছেলে পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর এখন তাঁর সঙ্গেই থাকেন।
এই বিক্রেতা আরও জানান, মাসে তাঁর আয় ২০–২১ হাজার টাকার বেশি নয়। আর মাসে ঘরভাড়া দেন ১০ হাজার টাকা। বাকি যা থাকে তা দিয়ে পরিবারের খাবার, ছেলের পড়াশোনা, তাঁর নিজের চিকিৎসার খরচ—হিসাব মেলাতে পারছেন না।
খাবার বিক্রেতা মো. হোসেন আরও বলেন, একটি সমিতি থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। কিছু টাকা কিস্তি দিয়েছেন। কিন্তু এখন বেচাবিক্রির যা অবস্থা, তাতে পুরো ঋণ কীভাবে শোধ করবেন বুঝতে পারছেন না।
‘লাভ কমতেছে’
হোসেনের দোকানের পাশেই ভাত, সবজি, গরুর মাংসসহ বিভিন্ন পদের খাবার বিক্রি করেন রোকসানা বেগম। এক প্লেট ভাত ও ডিমের ঝোলের দাম ৪০ টাকা। মুরগির মাংস, মাছ ও গরুর মাংস দিয়ে ভাত খেলে খরচ পড়ে ১০০ থেকে ১৩০ টাকা।
রোকসানা বেগমও বললেন, বিক্রি আগের চেয়ে কমে গেছে। কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বলতে পারমু না।’
চল্লিশোর্ধ্ব রোকসানার দুই ছেলে। বড় ছেলে নবম শ্রেণিতে আর ছোট ছেলে একটি মাদ্রাসায় পড়ছে। ফুটপাতে খাবার বিক্রির টাকাতেই চলে তাঁর সংসার। বলেন, ‘দিন দিন লাভ যেমনে কমতেছে, সামনে কী করমু জানি না।’
আগে দিনে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা বিক্রি হতো, এখন তা কমে চার হাজারে ঠেকেছে বলে জানান রোকসানা। সব খরচ বাদ দিয়ে ৭০০–৮০০ টাকার বেশি লাভ হয় না বলে জানান তিনি।
টিসিবি ভবনের কাছে, একটি খালি প্লটে পরিবার নিয়ে থাকেন রোকসানা বেগম। ওই প্লটটি দেখাশোনা করেন তাঁর স্বামী। সেখানে টিনের একটি ছোট ঘর আছে। সেই ঘরের ভাড়া দিতে হয় না, যে কারণে কোনো রকমে টিকে আছেন বলে জানান তিনি।
গতকাল দুপুরে যখন রোকসানা বেগমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তাঁর দোকানে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তি। মুরগির মাংস ও ডাল দিয়ে ভাত খাওয়ার পর তিনি বিল দিয়েছেন ৯০ টাকা। ফুটপাতের এই দোকানে নিয়মিতই খেতে আসেন তিনি।
খাবারের দাম বাড়ানোর চিন্তা
কারওয়ান বাজারের মতোই আগারগাঁও এলাকার ফুটপাতে সারি সারি খাবারের দোকান। গতকাল বেলা পৌনে একটার দিকে সেখানে কথা হয় খাবার বিক্রেতা সুমি হকের সঙ্গে। তিনি দুই বছর ধরে বাসা থেকে রান্না করে এনে আগারগাঁওয়ে মেট্রোস্টেশনের পাশের ফুটপাতে খাবার বিক্রি করেন।
সুমি হক বলেন, ‘যারা খাইতে আসে, তারা খুব সাধারণ মানুষ। দাম বাড়াইতে চাই না। কিন্তু সবকিছুর দাম যেমনে বাড়ছে, এখন আর উপায় নাই।’
আগামী ১ মে থেকে ভাত, মাছ, মাংসের দাম কিছুটা বাড়ানোর কথা ভাবছেন জানিয়ে এই বিক্রেতা বলেন, ‘আমারও তো বাঁচতে হবে। লাভ না হলে বিক্রি করব কেমনে।’
বেলা একটার দিকে সুমি হকের দোকানে খেতে আসেন হালিম মিয়াজি। তিনি আগারগাঁওয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি কাজে এসেছিলেন। খাওয়ার পর বলেন, ‘হোটেলে খেতে গেলে ২০০ টাকাতেও হয় না। এখানে ভাত–মাছ ১০০ টাকায় খেলাম।’