প্রথম আলোর প্রতিবেদনের সত্যতা পেয়ে শিশুর ভুয়া জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন বাতিলের নির্দেশ
লক্ষ্যপূরণের নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভুয়া জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ঘটনা নিয়ে প্রথম আলোর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সত্যতা মিলেছে সরকারি তদন্তে। অনুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে ভুয়া নিবন্ধন শনাক্ত করে তা বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ৮ জানুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুসারে, জালিয়াতির মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের বিষয়টি সরেজমিন তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেছে।
জেলার স্থানীয় সরকার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রথম আলো যে চারটি ইউনিয়নে অনুসন্ধান করেছে ও সংবাদে ভুয়া নিবন্ধন সনদের তথ্য তুলে ধরেছে, সেই প্রতিটি ভুয়া সনদ ধরে সরেজমিন করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের সহকারী নিবন্ধন কর্মকর্তা বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা তাঁদের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন।
জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহানের সই করা এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ভুয়া নিবন্ধন চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়াটি কঠোরভাবে পরিবীক্ষণ করতে হবে। কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ করতে হবে।
গত ১১ জানুয়ারি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন জেলা প্রশাসক। আর ১৩ জানুয়ারি আটটি নির্দেশনা দিয়ে মাঠপর্যায়ে চিঠি জারি করা হয়।
১৩ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ভুয়া নিবন্ধনের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, সেটির সত্যতা তিনি পেয়েছেন।
ভুয়া নিবন্ধনের তথ্য যেভাবে উঠে আসে
গত ২৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে ‘প্রথম আলোর অনুসন্ধান, শিশুর ভুয়া জন্ম-মৃত্যু দেখিয়ে নিবন্ধনের লক্ষ্যপূরণ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অনুসন্ধানে দেখানো হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে সংরক্ষিত জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ডেটাবেজে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া নিবন্ধন তৈরি করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ও বুধল, কসবা উপজেলার কুটি এবং আশুগঞ্জ উপজেলার চরচারতলা ইউনিয়নে সরেজমিন ঘুরে এসব ভুয়া নিবন্ধনের তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রেই ভুয়া সনদের ঘটনা বেশি। এমন অনেক শিশুর নিবন্ধন করা হয়েছে, যাদের বাস্তবে জন্মই হয়নি। কাগজে-কলমে তাদের জন্ম ও মৃত্যু দেখানো হয়েছে।
জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের নির্ধারিত লক্ষ্যপূরণের চাপ থেকেই মূলত ভুয়া নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ভুয়া নিবন্ধন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।শারমিন আক্তার জাহান, জেলা প্রশাসক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
১৩ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান প্রথম আলোকে বলেন, তিনি মন্ত্রণালয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ভুয়া নিবন্ধনের যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল, সেটির সত্যতা তিনি পেয়েছেন। প্রথম আলো যে চারটি স্থানে জালিয়াতির তথ্য পেয়েছে, তাঁরা সেগুলো অনুসন্ধান করেছেন।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের নির্ধারিত লক্ষ্যপূরণের চাপ থেকেই মূলত ভুয়া নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। ভুয়া নিবন্ধন ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভুয়া নিবন্ধন বাতিলের নির্দেশনা
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর ১১ জানুয়ারি পৌর প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা প্রশাসক বা প্যানেল চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করেন জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান। সেখানে তিনি ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে নয়, কেবল প্রকৃত তথ্য অনুযায়ী নিবন্ধন করার নির্দেশ দেন। জানা গেছে, সভায় জেলা প্রশাসক বলেন, প্রথম আলোর প্রতিবেদনটি জেলায় ‘টক অব দ্য টাউন, টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে গেছে’। এ ধরনের ঘটনা ঘটা খুব লজ্জাজনক বিষয়। ওই সময় অনেক সহকারী নিবন্ধন কর্মকর্তা টার্গেট পূরণের চাপের কথা উল্লেখ করেন। জেলা প্রশাসক তখন তাঁদের বলেন, ‘আপনারা লক্ষ্যপূরণ নয়, প্রকৃত তথ্য নিয়ে কাজ করুন।’
গত ২৬ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে ‘প্রথম আলোর অনুসন্ধান, শিশুর ভুয়া জন্ম-মৃত্যু দেখিয়ে নিবন্ধনের লক্ষ্যপূরণ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অনুসন্ধানে দেখানো হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয়ে সংরক্ষিত জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ডেটাবেজে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া নিবন্ধন তৈরি করা হয়েছে।
১৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য চিঠি জারি করা হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তারা তাঁদের নিজ নিজ নিবন্ধন কার্যালয়ের ২০২৫ সালের ভুয়া নিবন্ধন শনাক্ত করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জানাবেন এবং তা বাতিলের প্রস্তাব পাঠাবেন। ভুয়া নিবন্ধন চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াটি কঠোরভাবে পরিবীক্ষণ করতে হবে এবং কোনো ব্যত্যয় পাওয়া গেলে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ করার পদক্ষেপ নিতে হবে।
সিভিল সার্জনের কাছ থেকে ২০২৫ সালের সব নবজাতকের তালিকা সংগ্রহ করে দ্রুত নিবন্ধনের ব্যবস্থাসহ মোট আটটি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।