এবার সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা, দিচ্ছেন ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান

ছবি: নোমান ছিদ্দিক

সকাল থেকে সারা দিন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করে সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। জাতীয় সংসদে অধিবেশন চলার মধ্যে সন্ধ্যা ৬টা থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নিয়ে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দিচ্ছেন তাঁরা।

টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে গতকাল সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগ দাবিতে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও কঠিন প্রশ্ন করার অভিযোগও তুলেছেন। অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে দিলে যান বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে। সেখান থেকে ফিরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন।

বিকেল চারটার কিছু আগে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় আবার অবরোধ করেন। সকালেও তাঁরা এই মোড় অবরোধ করেছিলেন। ১৪ জুলাই
ছবি: সাজিদ হোসেন

সায়েন্স ল্যাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো দেখার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান শিক্ষামন্ত্রী। এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।

শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার পর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। সেগুলো হলো—অনতিবিলম্বে আজ সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে, যারা ১৩ জুলাই অস্বস্তিকর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং যারা করেনি, সব শিক্ষার্থীর পুনরায় পরীক্ষা নিতে হবে এবং আগামীকালের অর্থাৎ ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে, পরীক্ষার নতুন রুটিন প্রকাশ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে।

সকালে সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে শুরু করেছিলেন। বিকেলে আবার সেখানে এসেই অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ বিকেল চারটার দিকে
ছবি: নোমান সিদ্দিক
আরও পড়ুন

এসব দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে মিছিল নিয়ে জাতীয় সংসদ অভিমুখে যাত্রা করেন।

সায়েন্স ল্যাব মোড়ে তিন দফা ঘোষণা করেছিলেন ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম। সায়েন্স ল্যাব থেকে হঠাৎ কেন জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাল থেকে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের পরেও আমাদের পক্ষে কোনো ঘোষণা আসেনি। তাই আমরা সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছি, যাতে তাঁরা দেখেন শিক্ষার্থীরা কীভাবে সাফার (কষ্টভোগ) করছে।’

বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। আজ দুপুরে
ছবি: মীর হোসেন

যাঁরা পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাঁদের আবার পরীক্ষা নেওয়ার কথা শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন—এরপরে আন্দোলন কেন করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজুল বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা আমরা মানি না। এর আগেও তিনি অনেক ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো কিছুই তিনি বাস্তবায়ন করেননি। তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন তার বাস্তবায়ন হবে কি না, সে নিশ্চয়তা নেই। তাই আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে এই পদে যোগ্য মনে করছি না।’

দিনভর আন্দোলন

সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় এক ঘণ্টা অবরোধ করেন। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যান। বেলা সোয়া একটার দিকে ভিসি চত্বরের সামনে থেকে তাঁদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীরা পলাশীর মোড় হয়ে বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান।

শিক্ষার্থীরা বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এবং ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ইট ছোড়েন। গেটে ধাক্কাধাক্কি করেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান। সেখানে অবস্থান করছে আইনশৃঙ্খলা আজ মঙ্গলবার দুপুরে

এরপর শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সরে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড়ের দিকে আসেন। বিকেল চারটার কিছু আগে তাঁরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এ সময় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মো. সামির বলেন, কোথায় গিয়ে দাবি সঠিকভাবে তুলে ধরবেন, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। এ কারণে টিএসসিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে, হামলা করেছে এবং অনেকে আহত হয়েছেন।

ভিসি চত্বরের সামনে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে বাধা দেয় পুলিশ। আজ দুপুরে

দাবি না মেনে নেওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান। এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেন নগরীর বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। আজ দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব থেকে জাতীয় সংসদ অভিমুখে যাত্রা করেন।

ঢাকার মধ্যে এই অবরোধ–বিক্ষোভের পাশাপাশি ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ–অবরোধ হয়েছে।