স্বাধীন মতপ্রকাশের সঙ্গে দায়িত্ব অপরিহার্য: মাহফুজ আনাম

অধ্যাপক সিতারা পারভীন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতা দেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। ১৮ জানুয়ারিছবি: প্রথম আলো

স্বাধীন মতপ্রকাশ গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলেও এর সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের অধিকার যেমন মৌলিক, তেমনি সেই মত কতটা তথ্যভিত্তিক, গবেষণালব্ধ ও পক্ষপাতমুক্ত—সেটি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অধ্যাপক সিতারা পারভীন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতায় এসব কথা বলেন মাহফুজ আনাম। আজ রোববার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ১০ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করে অধ্যাপক সিতারা পারভীন ট্রাস্ট।

সমাজে সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা অনেকে অনুধাবন করতে পারেন না উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সাংবাদিকতার মূল মন্ত্র হচ্ছে, স্বাধীন মতপ্রকাশের একটি জায়গা।’

মতপ্রকাশকে বন্ধ করাই ছিল কিন্তু সভ্যতার বেশির ভাগ সময়ের ইতিহাস উল্লেখ করে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে গত ৮০-৯০ বছরেই এটার বিকাশ শুরু হয়েছে এবং বলতে পারেন যে গত ৫০ বছরে এটার পরিস্ফুটন আমরা দেখেছি। কিন্তু এখন আবার এটার বিকৃতির একটা জায়গা আসছে।’

মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবেও উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘আমি কী ভাবছি—এটা বলার অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে আপনার একটা দায়িত্ব আসে। আপনি যেটা ভাবছেন, এটা কি খুব সুচিন্তিত? এটা কি গবেষণার ভিত্তিতে, এটা কি পড়াশোনার ভিত্তিতে? এটা কি একটা বলতে পারেন যে একটা সমাজকে বোঝার, মানুষকে বোঝার, ওইটার ভিত্তিতে নাকি আমি ওই সময় একটা ইমোশনালভাবে কিছু বলে দিলাম।’

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সামঞ্জস্য রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘আমরা রাখতে ব্যর্থ হই। সাংবাদিকতা হচ্ছে এটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। এটার অর্থ কী? যে আমি স্বাধীন সাংবাদিকতার মাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশ করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখছি।’

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ও বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমি সাংবাদিকদের, ছাত্রছাত্রীদের অনুধাবন করতে বলব যে আমরা যখন সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। এখন সোশ্যাল মিডিয়াকে আপনি কীভাবে যাচাই করবেন? আমি সাইমলটেনিয়াসলি এটাকে দেখি একটা আশীর্বাদস্বরূপ। আবার এটাকে দেখি একটা ডেঞ্জারের ব্যাপারে। যেমন সত্যিকার অর্থে সামাজিক মাধ্যমগুলো আসার আগে হাতে হাতে কিন্তু মতপ্রকাশের সেই স্বাধীনতা ছিল না।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বিকাশ হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন কোনো ব্যক্তিকে আক্রমণ করেন, সেটা কিন্তু তার গণতান্ত্রিক অধিকারকে আপনি খর্ব করছেন। আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার মতপ্রকাশের। আবার আরেকজনের গণতান্ত্রিক অধিকার, তার শালীনতা রক্ষা করা, তার রেপুটেশন রক্ষা করা। তার যে গণতান্ত্রিক দায়িত্ব আছে তার অধিকার আছে—সেটা সম্বন্ধে এই সোশ্যাল মিডিয়াতে যথেষ্ট সচেতনতা আমরা পরিলক্ষিত করছি না।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক (সম্মান) ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের ১০ জন শিক্ষার্থীকে বৃত্তি প্রদান করে অধ্যাপক সিতারা পারভীন ট্রাস্ট।
ছবি: প্রথম আলো

দীর্ঘ বক্তব্যে ডেইলি স্টারের দর্শন ও সাংবাদিকতার নানা দিক নিয়ে ব্যাখ্যা তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, পত্রিকাটি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষাবলম্বন করে না। তবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও সরকারের জবাবদিহির প্রশ্নে তারা স্পষ্ট অবস্থান নেয়। তাঁর মতে, নির্বাচিত সরকার মানেই অবারিত ক্ষমতা নয়—গণমাধ্যমের কাজ হলো ক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে রাখা।

মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য অর্থনৈতিক স্বাধীনতাও জরুরি। সংবাদমাধ্যম যদি আর্থিকভাবে পরনির্ভরশীল হয়, তবে মালিকানা বা বিজ্ঞাপনদাতার চাপ স্বাধীনতা খর্ব করতে পারে। তাই পেশাদার ও নৈতিক সাংবাদিকতার মাধ্যমেই টেকসই ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে ডেইলি স্টার।
গণমাধ্যমের নিজেদের ভুল স্বীকারের প্রসঙ্গে এই সম্পাদক বলেন, ডেইলি স্টার কখনই ভুলের ঊর্ধ্বে দাবি করে না। ভুল হলে তা সংশোধন ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়াকে তারা পেশাগত দায়িত্ব বলে মনে করে। সাংবাদিকের ভূমিকা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিক সমাজের ‘সামাজিক চিকিৎসক’।

পরিবেশ, পানি, কৃষি ও উন্নয়নের উদাহরণ টেনে মাহফুজ আনাম বলেন, উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে তার ক্ষতিকর দিকগুলোও তুলে ধরা সাংবাদিকতার দায়িত্ব। উন্নয়নের নামে প্রকৃতি ধ্বংস বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্ষতি হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ করা জরুরি।

সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, এই পেশা অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ। তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করাই সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পুঁজি। সততা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে সাংবাদিকতায় আসার আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। এতে সভাপতিত্ব করেন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক তৈয়েবুর রহমান। অনুষ্ঠানে অধ্যাপক সিতারা পারভীনের জীবন ও কর্ম তুলে ধরেন বিভাগটির সহযোগী অধ্যাপক শাওন্তী হায়দার। এ ছাড়া গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রয়াত সিতারা পারভীনের স্বামী অধ্যাপক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী এতে বক্তব্য দেন।

অধ্যাপক সিতারা পারভীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তিনি ২০০৫ সালের ২৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো থেকে কানসাসে যাওয়ার পথে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। আইডব্লিউপিআরের আমন্ত্রণে একটি কনফারেন্সে অংশ নিতে ২০০৫ সালের ১৮ জুন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন তিনি।

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের মেয়ে সিতারা পারভীনের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (সম্মান) ও এমএ এবং আবার সাংবাদিকতায় এমএ ডিগ্রি অর্জনের পর পিএইচডি করেন ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ১৯৮২ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন আমৃত্যু।

সিতারা পারভীনের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র ছিল গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, নারী ও আদিবাসী। আদিবাসীবিষয়ক গবেষণায় তিনি বেছে নিয়েছিলেন মাতৃসূত্রীয় মান্দি (গারো) সম্প্রদায়কে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের মান্দি-অধ্যুষিত মধুপুর, দুর্গাপুর, বিরিশিরিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণার কাজ করেছেন।