একুশের স্মৃতি
প্রতিবাদের সূচনা
শিক্ষার্থীদের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন জনতার স্রোতোধারায় মিশে সফল হয়েছিল বায়ান্নর একুশে। সেই প্রতিবাদী দিনের অমলিন স্মৃতিকথা।
১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি। সেদিন পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পল্টন ময়দানে এক ভাষণ দেন। বক্তৃতায় তিনি অযাজিত এবং অপ্রত্যাশিতভাবে ঘোষণা করেন—উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে। খাজা নাজিমুদ্দীনের এ বক্তব্যের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ঢাকার অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
ঢাকায় খাজা নাজিমুদ্দীনের এ বক্তব্যের প্রতিবাদে ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট আহ্বান করা হয় এবং সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের একটি প্রতিবাদ সভা হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের খালেক নওয়াজ খান।
সভা শেষে যখন মিছিল বের করার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলো, তখন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মীরা এবং নেতৃবৃন্দ মিছিল করার বিরোধিতা করলেন। কিন্তু তাঁদের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগ্রামী ছাত্র–ছাত্রীরা সেদিন মিছিল বের করেন। মিছিলের শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘটের আহ্বান জানানো হয় এবং ৪ ফেব্রুয়ারিকে সফল করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির নেতৃবৃন্দ বিশেষ তৎপর হন।
এটা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল যে খালেক নওয়াজ খানের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কিছু সদস্য ৪ ফেব্রুয়ারি মিছিল করার বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করেছেন। ৪ ফেব্রুয়ারি মিছিল করার বিরুদ্ধে তাঁরা প্রতিবাদ করবেন, এ বিষয়টি সবার কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম ছাত্রলীগের এ তৎপরতার বিরুদ্ধে ৩ ফেব্রুয়ারি যুবলীগের নেতৃস্থানীয় কর্মিবৃন্দ এক বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যাতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মীরা ৪ ফেব্রুয়ারির মিছিল বানচাল করতে না পারেন, সে জন্য যুবলীগের কর্মীদের মধ্য থেকেই একজনকে ওই দিন সভায় সভাপতিত্ব করতে হবে।
যুবলীগের কর্মীদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালিত হলো। মিছিলবিরোধী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্যরা যাতে কোনো প্রকার সুযোগ না পান, তার জন্য যুবলীগ ও প্রগতিশীল ছাত্ররা বেশ তৎপর ছিল। মধুর রেস্তোরাঁ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় একটি ছোট টেবিল আনা হলো। এ সময় একটি হাস্যকর দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল। মধুর রেস্তোরাঁ থেকে টেবিলটি আনার পর চেয়ারের অপেক্ষা করছেন খালেক নওয়াজ খান।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অন্য কর্মীরাও অপেক্ষা করছেন। চেয়ার এসে সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই এম আর আখতার মুকুল টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠে সভাপতি হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করে দিলেন। তিনি যখন সভাপতির নাম প্রস্তাব করছেন, তাঁর মতলব বুঝতে পেরে সৈয়দ নুরুল আলম এম আর আখতার মুকুলের প্যান্ট ধরে টেনে নামানোর চেষ্টা করছিলেন। এ টানাহেঁচড়ায় বেচারা মুকুলের প্যান্টের কয়েকটি বোতামই ছিঁড়ে যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও এম আর আখতার মুকুল সভাপতি হিসেবে আমার নাম প্রস্তাবের কাজ সমাধা করেন।
এরপরই পুরো ছয় ফুট লম্বা কমরুদ্দিন শহুদ পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হয়ে হেঁড়ে গলায় প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। এম আর আখতার মুকুল টেবিল থেকে নেমে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি সভাপতির আসন নিলাম। চেয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে পারলাম না। টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠলাম এবং দুই মিনিট বক্তব্য দিয়েই মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করলাম।
সূত্র: ‘ভাষার লড়াইয়ের তুঙ্গ মুহূর্তগুলো’, গাজীউল হক, একুশের পটভূমি, একুশের স্মৃতি, সম্পাদক: মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশন।
গাজীউল হক: প্রয়াত ভাষাসংগ্রামী।