বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা–সুবিধার কথা জানেন না অনেকে

২৪টি বিশেষায়িত হাসপাতালে পাওয়া যাবে সুবিধা। জটিল রোগের চিকিৎসায় বরাদ্দ সর্বোচ্চ ২ লাখ।

চিকিৎসা
প্রতীকী ছবি

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাগজ হাতে ঘোরাঘুরি করছিলেন দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা। একজন এসেছেন যশোর থেকে। অপরজন ময়মনসিংহের। দুজনই এসেছেন তাঁদের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে। তবে কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে পৌঁছাতে পারছেন না।

নিজেদের সমস্যাসহ নানা বিষয় নিয়ে রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয় লিংক রোডে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আসেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তবে চিকিৎসাসহায়তার জন্য এই দুজনের মন্ত্রণালয়ে আসার দরকারই ছিল না। তাঁরা হাসপাতালে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলেই চিকিৎসাসেবা পেতেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশের বিশেষায়িত ২৪টি হাসপাতালে মুমূর্ষু বা জটিল রোগে আক্রান্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে। তাঁরা এসব হাসপাতাল থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা চিকিৎসা-সুবিধা পাবেন।

২৪ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও বেশির ভাগ বীর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি জানেন না। প্রচারণা কম হয়েছে বা যাঁদের এটা জানানোর দায়িত্ব, তাঁরা কাজটি ঠিকমতো করছেন না।
আকম মোজাম্মেল হক, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার চিকিৎসার জন্য আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হলে হাসপাতালে মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা ব্যয় করা হবে। আর সাধারণ রোগের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা বছরে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা-সুবিধা পাবেন।

ওপরের দুজনের মতো দেশের বহু বীর মুক্তিযোদ্ধাই সরকারের দেওয়া এই চিকিৎসা-সুবিধার কথা জানেন না। এই সুবিধার কথা তেমন প্রচারও পায়নি। এ নিয়ে ২০ জেলার ৩০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা হয়েছে প্রথম আলোর। তাঁদের বেশির ভাগই চিকিৎসা-সুবিধা দেওয়া হাসপাতালগুলোর নাম বা ২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিষয়টি জানেন না।

এমন একজন ফরিদপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার নজরুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, বীর মুক্তিযোদ্ধারা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা চিকিৎসা-সুবিধা পাবেন, এমন কোনো তথ্য তাঁর জানা নেই। এ নিয়ে কোনো ঘোষণা শোনেননি তিনি। এ-সংক্রান্ত পরিপত্রও দেখেননি। আগে সরকারি হাটবাজারের ইজারার টাকা থেকে চার ভাগ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ফান্ডে দেওয়া হতো। ওই অর্থ অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বণ্টন করা হতো। তবে তা এখন বাতিল করা হয়েছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ, পক্ষাঘাত, ক্যানসার, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ সমজাতীয় জটিল রোগের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসাসেবা পাবেন। বিশেষায়িত হাসপাতালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সুপারিশে ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে ২ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে।

এ নিয়ে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নলডাঙ্গা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মন্টু গোপাল চৌধুরী বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা বেশির ভাগ আর্থিকভাবে অসচ্ছল। অনেকে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেন না। অথচ সরকার তাঁদের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ রেখেছে, তা তাঁরা জানেনই না। এই টাকা পেলে তাঁরা অনেক উপকৃত হবেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা-সুবিধার বিষয়টি অনেকেই জানেন না বলে স্বীকার করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকও। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ২৪ হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হলেও বেশির ভাগ বীর মুক্তিযোদ্ধা বিষয়টি জানেন না। প্রচারণা কম হয়েছে বা যাঁদের এটা জানানোর দায়িত্ব, তাঁরা কাজটি ঠিকমতো করছেন না। চিঠি পাঠিয়ে ও বিজ্ঞাপন দিয়ে সারা দেশে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করা হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও চান তিনি।

যেভাবে এ সুবিধা পাবেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা

হাটবাজারের ইজারার টাকা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য ব্যয়ের আগের নীতিমালা বাদ দিয়ে ২০২২ সালের ১ নভেম্বর নতুন নীতিমালা করে সরকার। এরপর গত ৫ জুন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ, পক্ষাঘাত, ক্যানসার, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ সমজাতীয় জটিল রোগের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধারা চিকিৎসাসেবা পাবেন। বিশেষায়িত হাসপাতালে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সুপারিশে ও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে ২ লাখ টাকা ব্যয় করা যাবে। মুমূর্ষু কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধার জরুরি অস্ত্রোপচার ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করা যাবে। তবে এ বিষয়ে পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নিতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নগদ বা চেকের মাধ্যমে এই টাকা দেওয়া হবে না। তাঁরা হাসপাতাল থেকে সরাসরি চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন। এ জন্য কোনো আবেদনের প্রয়োজন হবে না, শুধু মুক্তিযোদ্ধার প্রমাণপত্র দেখাতে হবে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের স্ত্রী বা স্বামী বা সন্তান কেউ এই সুবিধা পাবেন না।

২৪টি বিশেষায়িত হাসপাতালের মধ্যে রয়েছে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদ্‌রোগ ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট, খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতাল, গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।