ঈদযাত্রা শুরুর দিন ৩ জুলাই থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার ১৭ জুলাই পর্যন্ত মোট ১৫ দিনের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে আজ মঙ্গলবার এ কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

এবার ঈদের আগে ও পরে সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয়ে তিন দিনের ছুটি ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কিছুদিন আগে ছুটি শুরু হয়। তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতি প্রতিবছরই ১৫ দিন ধরে ঈদের ছুটির পরিসংখ্যান যাচাই–বাছাই করে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল প্রতিবছরের মতো এবারও এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় দৈনিক, আঞ্চলিক ও অনলাইন দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ মনিটরিং করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

লিখিত বক্তব্যে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, করোনা বিধিনিষেধ না থাকায় এবারের ঈদে বেশি মানুষের যাতায়াত হয়। রাজধানী থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করেন। এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত করেন প্রায় চার কোটি মানুষ৷

নিষেধাজ্ঞার পরও সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা মোটরসাইকেলে

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেরার সময় সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৩৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৪০ জন নিহত ও ৭৯১ জন আহত হয়েছেন। গত বছর ঈদুল আজহায় সড়কে ২৪০টি দুর্ঘটনায় ২৭৩ জন নিহত হন, আহত হন ৪৪৭ জন। এই ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। ১১৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩১ জন নিহত হন, আহত হন ৬৮ জন। মোট দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৪২ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। নিহত ব্যক্তিদের ৩২ দশমিক ৯১ শতাংশই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার।

এবার ঈদযাত্রায় মহাসড়কে মোটরসাইকেলের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, মোটরসাইকেলের এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগ ঘটেছে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা থাকলেও মহাসড়কে কিছু কিছু মোটরসাইকেল চলেছে বলে জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন ১৫৭ জন চালক, ৮ জন পরিবহনশ্রমিক, ১০৬ পথচারী, ৬২ নারী, ৫১ শিশু, ৩৬ শিক্ষার্থী, ৬ সাংবাদিক, ৫ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও ৬ জন শিক্ষক। এ ছাড়া ছয়জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও একজন প্রকৌশলীর পরিচয় মিলেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৯১ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৬ দশমিক ৭০ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ১৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে সংঘটিত হয়েছে।

সংঘটিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ২৯ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ বাস, ২৩ দশমিক ১৮ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ড ভ্যান ও লরি, ১১ দশমিক ৪৭ শতাংশ অটোরিকশা, ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ও জিপ। এ ছাড়া ৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ নছিমন-করিমন, ট্রাক্টর, লেগুনা ও মাহিন্দ্রা আর ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ ছিল ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, ভ্যান ও সাইকেল।

এসব দুর্ঘটনার ২৩ দশমিক ১৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৫০ দশমিক ৭৮ শতাংশ পথচারীকে গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা। এ ছাড়া ১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ দুর্ঘটনা যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে সংঘটিত হয়েছিল।

দুর্ঘটনার দায় ও সুপারিশ

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্ঘটনার জন্য দায়ী জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের ব্যাপক ব্যবহার। এ ছাড়া উল্টো পথে যানবাহন চালানো, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহনের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। কিছু দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বেপরোয়া গতি, জাতীয় মহাসড়কে রোড সাইন এবং সড়কবাতি না থাকা।

দুর্ঘটনা বন্ধে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে রাতে চলাচলের জন্য আলোর ব্যবস্থা করা, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ, ধীরগতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনিশ্চিত করা, সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন করা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে সক্ষমতা বৃদ্ধি করা অন্যতম।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন