ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণ
গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের সামনে বাংলাদেশ, নতুন সরকারের জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ থাকার কথা উল্লেখ করেছে ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ।
জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সাংবিধানিক পথে ফিরবে শুধু এমনটাই নয়; বরং ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের পর এই প্রথম দেশে সত্যিকারে জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার ক্ষমতায় বসবে। তাই বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাটা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠি। এই অভিমত জানিয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ থাকার কথা উল্লেখ করেছে ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজে)।
গতকাল সোমবার আইসিজের ওয়েবসাইটে ‘গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটছে’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখায় এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, এই নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই নির্বাচনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নির্বাচনের পর সরকারকে দেশের ভেতর ও বাইরে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ সামাল দিতে হবে। এর মধ্যে দেশের ভেতরে দুর্বল প্রতিষ্ঠান, পোশাকশিল্পনির্ভর ধীরগতির অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশে সামাজিক চাপ সামাল দিতে হবে। এর মধ্যে দেশে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দেশের বাইরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলার মতো বিষয়গুলোও সামলে নিতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী সরকার পতনের পর প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আইসিজের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ টমাস কিন এই নির্বাচনের গুরুত্ব, ঝুঁকি ও সম্ভাবনা, অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়ন ও বাংলাদেশ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো কারা
আইসিজের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলাদেশের দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তির একটি—শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অনুপস্থিতি। তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মধ্যে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ দল এবং আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। দলটির সারা দেশে শক্তিশালী সাংগঠনিক বিস্তৃতি ও ব্যাপক জনসমর্থন রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক বছরে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকের ধারণা, বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা–কর্মীরা চাঁদাবাজি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত।
অবশ্য সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা বিএনপির পক্ষে যেতে পারে। এর একটি ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরা। তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের প্রথম সমাবেশে বিপুল জনসমাগম ঘটে। এতে বিএনপিবিরোধী নেতিবাচক সংবাদ অনেকটাই আড়ালে চলে যায়।
দ্বিতীয়টি তারেক রহমান ফেরার মাত্র পাঁচ দিন পর তাঁর মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু। তাঁর জানাজায় বিপুল জনসমাগমে শুধু বিএনপি–সমর্থক নয়, বহু সাধারণ মানুষও অংশ নেন; যাঁরা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন।
অপর দিকে নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল। শেখ হাসিনার শাসনামলে দলটি ব্যাপক দমন-পীড়নের শিকার হয়। তবে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে জামায়াতের ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় ভূমিকার কারণে দলটি সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে।
দলটির আমির শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তরুণদের মধ্যে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে অবস্থান ও গণহত্যায় সম্পৃক্ততার মতো বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে তরুণদের অনেকের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম।
গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়ে জামায়াত সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই জোট এনসিপির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং অনেক নেতা দল ছেড়ে গেছেন। স্বল্প মেয়াদে এটি এনসিপির আসন পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ালেও দীর্ঘ মেয়াদে দলটি জামায়াতের সহযোগী হিসেবেই পরিচিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রগতি কতটা
আইসিজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য বজায় রাখা এবং ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন অন্তর্বর্তী সরকারের বড় অর্জন। সনদে ৮৪টি প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাস, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা জোরদার এবং বিচারক নিয়োগে দলীয় প্রভাব কমানোর মতো প্রস্তাব এতে অন্তর্ভুক্ত।
তবে আইনশৃঙ্খলা খাতে সংস্কার প্রায় অগ্রগতি পায়নি। পুলিশ বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা ফেরেনি। পুলিশের দুর্বল অবস্থানের কারণে মব ভায়োলেন্স (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ হামলা), বিশেষ করে দল বেঁধে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা বেড়েছে। র্যাব, ডিজিএফআইয়ের মতো সংস্থায় সংস্কার হয়নি। নারী ও গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের অনেক সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। এতে জনগণের একাংশের ধারণা, অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
পরবর্তী সরকারের সামনে কী চ্যালেঞ্জ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। পাশাপাশি হিযবুত তাহ্রীরের মতো উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি এবং সন্ত্রাসবাদ নজরদারিতে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ৩০ বছরের নিচে। অনেক তরুণ শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন না, যা গভীর হতাশা তৈরি করছে। তাঁরা শুধু চাকরি নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা ও প্রবৃদ্ধির সুফলের ন্যায্য বণ্টনও চান।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সামান্য ব্যর্থতাও এই ধারণা জোরদার করতে পারে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল পোশাকি ছিল।
পরবর্তী সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার কঠিন প্রশ্নও মোকাবিলা করতে হবে। ইতিহাস ও জনভিত্তির কারণে আওয়ামী লীগ চিরদিন রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না। কিন্তু ২০২৪ সালের সহিংসতার জন্য প্রকৃত অনুশোচনা ছাড়া দলটির ফেরা বিতর্কিত হবে। ভারতসহ প্রভাবশালী দেশগুলো সংলাপের মাধ্যমে সমাধানে ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ বছরের মেয়াদপ্রাপ্ত নির্বাচিত সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় এসব জটিল সংকট মোকাবিলায় ভালো অবস্থানে থাকবে। সাম্প্রতিক অস্থিরতার অধ্যায় পেরিয়ে যেতে বাংলাদেশকে সহায়তা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও দায়িত্ব।