‘যত কম টাকায় খাওয়া যায় চেষ্টা করি’, বললেন রিকশাচালক আনসার

রিকশাচালক মো. আনসার আলী। গতকাল বিকেলে মালিবাগেছবি: প্রথম আলো

সড়কের পাশে প্যাডেলচালিত রিকশা রেখে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে খাবারের একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানে গেলেন মো. আনসার আলী (৭৪)। একটি পরোটা নিয়ে পাশে থাকা টেবিলে বসে খেতে শুরু করেন। পরনের জলপাই রঙের শার্টটা ঘামে ভিজে গেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মালিবাগ মোড়ে দেখা গেল এ দৃশ্য।

আনসার আলী যাত্রাবাড়ী থেকে একজন যাত্রী নিয়ে শান্তিবাগে এসেছেন। যানজট ঠেলে যাত্রাবাড়ী থেকে শান্তিবাগে পৌঁছাতে এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। যাত্রী নামিয়ে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন।

একটি পরোটাই কি দুপুরের খাবার, জিজ্ঞাসা করতে আনসার আলী বলেন, ‘কী করব বাবা। ইনকাম তো নাই। পায়ের রিকশা চালাই। একটা ছেলে কোরআনে হাফেজ বানাইছি। এখন কিতাবখানায় পড়ে। কী করব, কোনো সহযোগিতাও পাই না।’

যত কম টাকায় খাওয়া যায় চেষ্টা করি। কখনো কখনো না খেয়ে থাকি। ভাত খেলে তার সঙ্গে কম দামের শাকসবজি খুঁজি। মাছ, মাংস কবে খেয়েছি মনে নেই। কয়েক মাস আগে একটি দাওয়াতে মাংস খেয়েছিলাম।
আনসার আলী, রিকশাচালক

আনসার আলীর গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলায়। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় আসেন। এরপর থেকেই প্যাডেলচালিত রিকশা চালিয়ে জীবন চালাচ্ছেন। শনির আখড়ায় একটি রিকশার গ্যারেজে থাকেন। ছয় সদস্যের পরিবারের দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে শহিদুর রহমান (১৮) বরিশালের একটি কওমি মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে মারুফ হোসেন (১৪) আগে পড়াশোনা করলেও আর্থিক অনটনে এখন তা বন্ধ। সে গ্রামের বাড়িতে মা খালেদা বেগমের সঙ্গে থাকে।

সকালের নাশতায় ১টি পরোটা ও ১০ টাকার এক প্লেট ভাজি খেয়েছেন বলে জানান আনসার আলী। তিনি বলেন, ‘যত কম টাকায় খাওয়া যায় চেষ্টা করি। কখনো কখনো না খেয়ে থাকি। ভাত খেলে তার সঙ্গে কম দামের শাকসবজি খুঁজি। মাছ, মাংস কবে খেয়েছি মনে নেই। কয়েক মাস আগে একটি দাওয়াতে মাংস খেয়েছিলাম।’

ব্যাটারিচালিত রিকশা কেন চালান না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা অনেক ভারী। কোথাও চার্জ শেষ হয়ে গেলে সেটিকে টেনে গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার শক্তি তাঁর শরীরে নেই। এ ছাড়া রিকশা কেনার মতো টাকাও নেই তাঁর।

আগে রিকশা চালিয়ে চলা গেলেও এখন আগের মতো সুযোগ নেই বলে জানালেন। প্যাডেলচালিত রিকশার কদর কমে গেছে উল্লেখ করে আনসার আলী বলেন, ‘আগে রিকশার টাকা জমা দিয়েও ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা থাকত। এখন রিকশার ১০০ টাকা জমা দেওয়ার পর দেড়–দুই শর বেশি থাকে না।’

ব্যাটারিচালিত রিকশা কেন চালান না—এমন প্রশ্নে তিনি জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা অনেক ভারী। কোথাও চার্জ শেষ হয়ে গেলে সেটিকে টেনে গ্যারেজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার শক্তি তাঁর শরীরে নেই। এ ছাড়া রিকশা কেনার মতো টাকাও নেই তাঁর।

বড় ছেলের পড়াশোনার খরচের জন্য প্রতি মাসে আড়াই হাজার টাকা ও পরিবারের খরচের টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। আজ (গতকাল) বড় ছেলেকে ৫০০ টাকা পাঠাতে হবে জানিয়ে এই রিকশাচালক বলেন, ‘সকাল থেকে ভাড়া পেলাম ২০০ টাকার। পায়ে চালানো রিকশা ও শরীরের অবস্থা দেখে মানুষ আমার রিকশায় উঠতে চায় না।’

কমে গেছে বিক্রি, টানাপোড়েনে দিন

শান্তিবাগে বেলা দুইটার সময় কথা হলো ভ্রাম্যমাণ ফল ও আদা-রসুন বিক্রেতা মো. খোকার (৬৯) সঙ্গে। তিনি জানান, বেশ কয়েক বছর ধরে আদা, রসুন ও যেকোনো একধরনের ফল ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। আজও (গতকাল) ২০ কেজি আদা, ১০ কেজি রসুন ও ১০ কেজি জামরুল এনে বিক্রি করছেন তিনি। এসব কেনার জন্য ভোর চারটার সময় তাঁকে কারওয়ানবাজারে যেতে হয়। এরপর সেখান থেকে পণ্য এনে বিক্রি করেন।

ভ্রাম্যমাণ ফল ও আদা-রসুন বিক্রেতা মো. খোকা। গতকাল দুপুরে শান্তিবাগে
ছবি: প্রথম আলো

দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ার পর থেকে আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না বলে জানালেন এ ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা। তিনি বলেন, ‘দাম কম থাকতে মানুষ বেশি কিনত, দাম বাড়ার পর থেকে এখন কম কিনতেছে।’

মো. খোকার গ্রামের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুরে। কারওয়ান বাজার এলাকায় একটি মেসে ভাড়া থাকেন। তিন ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে থাকেন। সারা দিন বিক্রি করে যা পান, তা দিয়ে নিজের খরচ চালান এবং স্ত্রীর জন্য কিছু টাকা বাড়িতে পাঠান।

দোকান ছেড়ে এখন হাজিরা শ্রমিক

পল্টনের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন দেলোয়ার হোসেন (৫৮)। দেড় বছর আগে যাত্রাবাড়ী মাছের আড়তে তাঁর একটি খাবারের দোকান ছিল; কিন্তু লোকসানের কারণে সেটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বর্তমানে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন।

দেলোয়ার হোসেন জানান, পরিবারসহ যাত্রাবাড়ীতে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। পাঁচ ছেলের মধ্যে তিন ছেলে বিয়ে করে আলাদা থাকেন। ছোট দুই ছেলে মাছের আড়তে কাজ করে কোনো রকমে পরিবারে সহায়তা করছে। ফলে কোনো রকমে সংসার চলছে। তবে গত সপ্তাহে ঋণ করে মেয়ে ইমার বিয়ে দিয়েছেন বলে জানান।