বেকারত্ব আশানুরূপ কমছে না

বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনুসারে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে কোনো কাজে না থাকা তরুণের সংখ্যা বাড়ছে।

বেকারত্বপ্রতীকী ছবি

কৃষি অর্থনীতি বিষয়ে ২০২১ সালে স্নাতকোত্তর পাস করেন এক তরুণ (২৮)। তিনিসহ তাঁর ব্যাচের ৪৫ জনের মধ্যে ১০–১২ জন এখনো বেকার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তরুণ জানান, সরকারি চাকরির আকালের মধ্যে প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। চাকরির জন্য স্নাতক–স্নাতকোত্তর পাস অনেক তরুণ এখন অফিস সহকারী বা রেলওয়ের ওয়েম্যানের চাকরিপ্রার্থী হচ্ছেন। তিনি একবার ১৩ গ্রেডের এক পদে মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত যেতে পেরেছিলেন।

সরকারি তথ্য অনুসারে, দেশে এখন নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী, অর্থাৎ শিশু ও বয়স্কদের চেয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি। ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার ৬৫ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ জনগোষ্ঠী।

আরও পড়ুন

জনসংখ্যাবিদদের মতে, এই বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনুসারে কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যাচ্ছে না। ফলে কোনো কাজে না থাকা তরুণের সংখ্যা বাড়ছে। বেকারত্বও আশানুরূপ কমছে না। দেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশ পাওয়ার সুবিধার মধ্যে রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মে সুযোগ সৃষ্টি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা না গেলে জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল পাওয়া যাবে না।

১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীকে কর্মক্ষম বলা হয়। একটি দেশের মোট কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত নির্ভরশীল জনসংখ্যার চেয়ে বেশি হলে সেই অবস্থাকে জনমিতিক লভ্যাংশ বলে। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখের বেশি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৫৬ লাখের বেশি এবং পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৪১ লাখের বেশি।

সমতার ভিত্তিতে জনসংখ্যাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে আজ ১১ জুলাই, বৃহস্পতিবার বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক উপাত্ত ব্যবহার করি, সাম্যের ভিত্তিতে সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ি’।

আরও পড়ুন

কাজে নেই বড় অংশ

গত ৫ জুন প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) আর্থসামাজিক ও জনমিতিক জরিপ ২০২৩ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে বেকারত্বের হার ৩ শতাংশ। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৫৭ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৯ শতাংশ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ কোনোটিতেই নেই। পুরুষদের মধ্যে এ হার ১০ শতাংশ হলেও নারীদের মধ্যে এ হার প্রায় ২৭ শতাংশ। তবে নারীর চেয়ে পুরুষের বেকারত্বের হার বেশি।

গত ৬ মে প্রকাশিত বিবিএসের ত্রৈমাসিক (জানুয়ারি থেকে মার্চ) শ্রমশক্তি জরিপ–২০২৪ (সাময়িক) অনুসারে, দেশে শ্রমশক্তি রয়েছে ৭ কোটি ৩৭ লাখ। এর মধ্যে ২৫ লাখ ৯০ হাজার বেকার। বাকিরা কর্মে নিয়োজিত। বেকারত্বের হার প্রায় ৪ শতাংশ। ২০২৩ সালের প্রথম ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনেও এ হার একই ছিল। ২০২৩ সালের বার্ষিক সাময়িক প্রতিবেদনের তুলনায় বেকারত্বের হার কিছুটা বেড়েছে। এ বছরের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুসারে, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তির সংখ্যা ২ কোটি ৫৯ লাখ, যা আগের দুই বছরের তুলনায় কমেছে।

আরও পড়ুন

বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ–তরুণী শিক্ষা–কর্ম বা প্রশিক্ষণে নেই। পুরুষদের মধ্যে এ হার প্রায় ১৯ শতাংশ এবং নারীদের মধ্যে এ হার প্রায় ৬১ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি বছর যতসংখ্যক কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, সেই পরিমাণ কাজের সুযোগ নেই। ফলে বেকারত্ব, যুব বেকারত্বের চ্যালেঞ্জ থেকে যাচ্ছে। শিক্ষা ও দক্ষতা অনুসারে কাঙ্ক্ষিত কাজ পাচ্ছেন না তরুণেরা। এই কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়ে আসতে না পারলে দেশ জনমিতিক লভ্যাংশ পাওয়ার যে সুবিধায় রয়েছে, তা অর্জন করতে পারবে না। জনমিতিক লভ্যাংশ পাওয়ার জন্য জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া, কর্মের সুযোগ পাওয়া এবং সমাজে সুশাসন ও জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন

নারীরা আরও পিছিয়ে

২০১৭ সালে এসএসসি পাসের পর লালমনিরহাটের আনোয়ারা আক্তারের (২৪) বিয়ে হয়। তাঁর বাড়ি আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নে। এখন তিনি দুই সন্তানের মা। বিয়ের পর আর পড়েননি। এ পর্যন্ত কখনো উপার্জনমূলক কাজে যুক্ত হননি। কৃষিজীবী স্বামীর আয়ে চলে সংসার।

গত জুন মাসে প্রকাশিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বৈশ্বিক জেন্ডার অসমতা প্রতিবেদন ২০২৪–এ বলা হয়েছে, লিঙ্গভিত্তিক বা জেন্ডার সমতা সূচকে গত বছরের চেয়ে বাংলাদেশে ৪০ ধাপ নেমেছে। ৬৮ দশমিক ৯ স্কোর পেয়ে এ বছর ১৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৯৯তম অবস্থানে আছে। গত বছর ৭২ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৫৯তম। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষার সুযোগ, স্বাস্থ্যসেবা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন—এই চার সূচকে নারী, পুরুষ ও অন্য লিঙ্গের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশ লাগাতার খারাপ করছে। গত ৫ বছরে শ্রমশক্তিতে বৈষম্য আরও বেড়েছে। নারী-পুরুষের আয়ে অসমতা ৫ গুণ বেড়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সূচকেও গত বছরের চেয়ে বাংলাদেশের অবনমন হয়েছে।

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশ কার্যালয়ের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ আবু সাইদ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, প্রান্তিক পরিবারগুলো মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে চায় না। বাল্যবিবাহ দিয়ে মেয়েটির দায়িত্ব আরেকটি পরিবারের ওপর দিয়ে দিতে চায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ব্যাপক হারে। মেয়েটির পড়ালেখা বন্ধ হয়, অল্প বয়সে গর্ভধারণের কারণে শিশুসন্তান ও মেয়েটি মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ে, স্বাস্থ্যহানির শিকার হয়। মেয়েটির উপার্জন করার পথও বাধাগ্রস্ত হয়। সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনতে নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতেই হবে। কোন জনগোষ্ঠী বেশি পিছিয়ে আছে এবং কোন ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, সেই পরিকল্পনা করার জন্য জনসংখ্যাবিষয়ক যথাযথ উপাত্ত তৈরি করতে হবে।