‘মা, শরীর জ্বলে যাচ্ছে’
চারপাশে দগ্ধ রোগীদের গোঙানি আর আর্তনাদ। সেই সব বিষণ্ন শব্দের মধ্যে সুহা আক্তারের (১৮) শয্যার কাছে গিয়ে দেখা গেল, তিনিও যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। বারবার বলছিলেন, ‘মা, শরীর জ্বলে যাচ্ছে।’ পাঁচ দিন ধরে সুহা শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দগ্ধ নারী ও শিশুদের জন্য উচ্চ নির্ভরতা বিভাগ (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট–এইচডিইউ) ৭ নম্বর শয্যায় চিকিৎসাধীন।
সুহার পরিবারের অভিযোগ, কলহ থেকে স্বামী সুমন বাপ্পী (২৬) সুহার ওপর অ্যাসিড ছোড়েন। এ ঘটনায় সুহার বড় বোন মারিয়া জান্নাত বাদী হয়ে গত ২৮ জুন সুমনের বিরুদ্ধে ‘অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২’–এ মামলা করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর থেকে স্বামী পলাতক।
আজ শনিবার বেলা দেড়টায় সুহার ড্রেসিং চলছিল। ওই সময় এইচডিইউর সামনে কথা হয় সুহার মা সাথি খানমের সঙ্গে। পরে তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পরিধান করে এই প্রতিবেদক দেখা করতে যান সুহার সঙ্গে। তাঁর দুই হাত আর বুক ব্যান্ডেজে মোড়া। মুখের বাঁ দিক পোড়া। এই প্রতিবেদককে বললেন, ‘আমার মুখটা কি আর ঠিক হবে না!’
দুই বছর আগে সুহার বিয়ে হয়। তাঁর ১০ মাসের ছেলে রয়েছে। বিয়ের পর টাঙ্গাইল সদর উপজেলার শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু ছয়–সাত মাস ধরে সুহা সন্তানকে নিয়ে বড় বোনের বাড়িতে মা-বোনের সঙ্গে সদর উপজেলায় পুরান বাসস্ট্যান্ড এলাকায় থাকছিলেন।
চিকিৎসার কাগজপত্র অনুসারে, সুহা রাসায়নিক পদার্থে দগ্ধ। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটিকে তিনি দেখেছেন। কেউ দাহ্য পদার্থে নাকি অ্যাসিডে দগ্ধ সেটা পুলিশ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যায়। চিকিৎসকেরা ‘কেমিক্যাল বার্ন’ হিসেবে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করেন। তিনি বলেন, অ্যাসিড বা অন্য দাহ্য পদার্থ দুটোই দেহের জন্য সমান ক্ষতিকর। এসব ক্ষেত্রে দগ্ধ হওয়ার পরপর তাৎক্ষণিকভাবে প্রচুর পানি ঢালা উচিত এবং আইনি ব্যবস্থা নিতে আলামত সংগ্রহে রাখা প্রয়োজন।
সংসারে কলহ ছিল
সুহার মা সাথি বললেন, তাঁর তিন মেয়ে। সুহা মেজ। সুহারা ছোট থাকতেই স্বামী আরেকটা বিয়ে করে আলাদা থাকেন। ভাই-বোনেরা তাঁর মেয়েদের বড় করেছেন। লোকজন বলত, ‘এত সুন্দর সুন্দর মেয়ে তোমার। বিয়ে দিয়ে দাও।’ অভাবের সংসারে তিন মেয়েকেই বাল্যবিবাহ দিয়েছেন। সুহা উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছেন। স্বামী এসএসসি পাস।
সাথি খানম বলেন, সুমন বিয়ের আগে বলেছিলেন, তাঁর বাড়ি ও ওষুধের দোকান আছে। পরে দেখা গেছে, তিনি দোকানের কর্মচারী, বাড়িও নেই। প্রতারণা ও অনটনের কারণে সুহা ও সুমনের কলহ লেগে ছিল। ছয়-সাত মাস আগে সুহাকে মারধর করে সুমন তাঁকে (সাথি খানম) বলেন মেয়েকে নিয়ে যেতে। ঘটনার দিন ২৬ জুন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় সুহার মুঠোফোনে সুমন কল দিয়ে নিচে নামতে বলেন এবং ছেলের জন্য কেনা মালটা আর ফর্মুলা দুধ নিয়ে যেতে বলেন। সুহা তিনতলা থেকে নিচে নামার কিছুক্ষণ পর তিনি মেয়ের প্রচণ্ড চিৎকার শুনতে পান।
সুহা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর হাতে মালটা আর দুধ দিয়ে স্বামী তাঁকে অ্যাসিড ছুড়ে মারেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সুহার স্বামীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
মামলা হয়েছে অ্যাসিড নিক্ষেপের
টাঙ্গাইল সদর থানা–পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সাঈদ ইবনে রাজীব সুহার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। প্রথম আলোকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, ওই ঘটনায় ‘অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২’–এর ৫ এর (ক) ও (খ) ধারায় মামলা হয়েছে। সুহার স্বামীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা হচ্ছে। তিনি বলেন, কী পদার্থ দিয়ে দগ্ধ করা হয়েছে, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আলামত জব্দ করা হয়েছে। অ্যাসিড না হয়ে যদি অন্য কোনো দাহ্য পদার্থ দিয়ে দগ্ধ করা হয়, তাহলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা স্থানান্তর হবে।
‘অ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২’–এর (ক) ধারায় বলা হয়েছে, অ্যাসিড নিক্ষেপে কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নষ্ট হয় বা মুখমণ্ডল, স্তন বা যৌনাঙ্গ বিকৃত বা নষ্ট হয় তাহলে অ্যাসিড নিক্ষেপকারীর সাজা মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড। (খ) ধারা অনুসারে, শরীরের অন্য কোনো অঙ্গ, গ্রন্থি বা অংশ বিকৃত বা নষ্ট হয় বা শরীরের কোনো স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হলে সাজা সর্বোচ্চ ১৪ বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড।
‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’–এর ৪ ধারা অনুসারে ‘দহনকারী, ইত্যাদি পদার্থ দ্বারা সংঘটিত অপরাধের শাস্তি’ অ্যাসিড নিক্ষেপের শাস্তির মতোই। অতিরিক্ত আরও রয়েছে দহনকারী, ক্ষয়কারী অথবা বিষাক্ত পদার্থ কোনো শিশু বা নারীর ওপর নিক্ষেপ করা হলে বা চেষ্টা করা হলে এবং এতে কোনো ক্ষতি না হলেও সাজা সর্বোচ্চ ৭ বছর ও সর্বনিম্ন ৩ বছর এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড।
অ্যাসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) তথ্য অনুসারে, ১৯৯৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ২৪ বছরে ৩ হাজার ৮৭০ জন অ্যাসিডদগ্ধ হয়েছেন। সারা দেশের অ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় ৬০০ মামলা বিচারাধীন। ২০২২ সালে ২৭ জন অ্যাসিডদগ্ধ হন। এর মধ্যে যৌতুক, বিবাহবিচ্ছেদ ও পারিবারিক বিরোধ থেকে অ্যাসিড সহিংসতার হার ছিল ৪৭ শতাংশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৩ জন নারী ও শিশুর অ্যাসিড দগ্ধ হওয়ার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশ পেয়েছে।
এএসএফের নির্বাহী পরিচালক সরদার জাহাঙ্গীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা রোধে আইনের আরও কঠোর প্রয়োগ, জেলায় জেলায় অ্যাসিড বিক্রির ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।