জ্বালানি তেলের সংকটে মাছ আহরণ কমেছে অন্তত ১০%

জ্বালানিসংকটে অনেক জাহাজ ও নৌযান নিয়মিত সাগরে যেতে পারছে না।

তিন কারণে সমুদ্রে কমেছে মাছ ধরা। তাই বেশির ভাগ সময় সমুদ্র ও নদীর তীরে অলস সময় পার করেন জেলেরা। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম নগরের ফিরিঙ্গীবাজার এলাকায়ছবি: সৌরভ দাশ

জ্বালানি তেলের সংকটে সাগরে নিয়মিত মাছ শিকারে যেতে পারছে না দেশের সমুদ্র অঞ্চলের অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ ও কাঠের নৌযান (ট্রলার)। ফলে উপকূলীয় জেলেদের পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর মাছ আহরণ কমেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে জ্বালানিসংকট শুরুর পর সাগর থেকে মাছ ধরা ১০-১৫ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩০ হাজার নৌযান ও বাণিজ্যিক জাহাজ সাগরে মাছ ধরে। এগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে ১০ হাজার টন মাছ ও চিংড়ি আহরণ করা হয়। তবে সম্প্রতি জ্বালানিসংকটে অনেক জাহাজ ও নৌযান নিয়মিত সাগরে যেতে পারছে না। যেসব নৌযান সাগরে যাচ্ছে, তাদেরও সাগরে অবস্থানের সময় কমেছে। এ ছাড়া জেলি ফিশের আধিক্য, সাগর উত্তালসহ প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবে মাছ আহরণ কমেছে।

ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে মাছ আহরণের পরিসংখ্যান এখনো হয়নি। তবে এই দুই মাসে মাছ আহরণ স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।
মো. জহিরুল হক, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তর

দেশে সাগরে মাছ শিকার করা নৌযান ও জাহাজ দুই ধরনের। তুলনামূলক ছোট এবং উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ শিকার করা ‘আর্টিশনাল ফিশিং বোট’ এবং গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করা বড় বাণিজ্যিক জাহাজ। এর মধ্যে নিবন্ধিত আর্টিশনাল বোট রয়েছে ২৯ হাজার ৬৭১টি। মাছ ধরার বাণিজ্যিক জাহাজ রয়েছে ২৬৮টি।

উপকূলীয় মৎস্যশিকারি ও সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, আর্টিশনাল ফিশিং বোটগুলোর মৎস্য ধারণক্ষমতা ৫০০ থেকে ৫ হাজার কেজি। এসব নৌযান সাগরে ১২ থেকে ১৫ দিন থাকে। প্রতিদিন ২০০ লিটার থেকে ১ হাজার লিটার জ্বালানি লাগে প্রতিটি নৌযানে।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. জহিরুল হক বলেন, ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে মাছ আহরণের পরিসংখ্যান এখনো হয়নি। তবে এই দুই মাসে মাছ আহরণ স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।

মাছ আহরণ বন্ধ

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হয়। এর জবাবে তেহরানও প্রতিশোধমূলক হামলা চালায়। যার প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে থাকে। দেশের জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দেয়। জ্বালানি তেল নিতে মানুষের ভিড় বাড়ে ফিলিং স্টেশনে।

জ্বালানি তেলের সংকটে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় উপকূলীয় জেলেরা এখন নিয়মিত মাছ শিকারে সাগরে যেতে পারছেন না। সংশ্লিষ্ট জেলার মৎস্য কর্মকর্তা ও মৎস্যশিকারিদের তথ্য অনুযায়ী, তুলনামূলক ছোট এসব নৌযান ডিজেলচালিত। জ্বালানি না পাওয়ায় মৌসুমের শেষ সময়েও তাঁদের মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতে হচ্ছে।

কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় জেলার অন্তত ৪ হাজার ট্রলারে মাছ আহরণ বন্ধ রয়েছে। যে পরিমাণ ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে উপকূল থেকে সাগরের ১০ থেকে ১২ কিলোমিটারের বেশি দূরে পৌঁছানো যায় না। মাছ ধরতে হলে ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে জাল ফেলতে হয়।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য দপ্তর জানায়, জেলায় ৫ থেকে ৬ হাজার নৌযান এখন সাগরে যেতে পারছে না। নন-মেকানাইজড (অযান্ত্রিক) এসব নৌযানে দৈনিক ১২০ থেকে ১৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে তাঁরা জ্বালানি পাচ্ছেন ২৫ থেকে ৩০ লিটার।

এই পরিস্থিতির মধ্যে ১৫ এপ্রিল শুরু হচ্ছে সাগরে মাছ ধরার ওপর টানা ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা। সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, প্রজনন নিশ্চিত করা ও টেকসই আহরণের লক্ষ্যে এ সময় বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকবে।

কম জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে গড়ে প্রতি মাসে আহরণ ১২ হাজার টনের বেশি মাছ। পরের দুই অর্থবছরে সেটি নেমে আসে ৯ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৭০০ টনে। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে গড়ে ১০ হাজার ৮০০ টনের বেশি মাছ আহরণ করা হয়েছে। গত তিন মাসে সেটি গড়ে ৮ হাজার টনে নেমে এসেছে।

দেশের সমুদ্র এলাকায় ২৬৮টি বাণিজ্যিক জাহাজ বর্তমানে মৎস্য শিকার করে। এর মধ্যে চিংড়ি শিকার করে এমন জাহাজ ৩৫টি। বাকিগুলো মাঝসাগর ও গভীর সাগরে মাছ শিকার করে। এসব জাহাজে মাছ ধারণক্ষমতা ১০০ থেকে ২০০ টন এবং ফিশিং ট্রিপ ২৪ থেকে ২৬ দিন। দৈনিক গড়ে অন্তত ৩ হাজার লিটার
ডিজেল প্রয়োজন হয় এসব জাহাজে। জ্বালানিসংকটে এই জাহাজগুলো ফিশিং ট্রিপ ২০ দিনে নামিয়েছে।

বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এনাম চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় কম জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে। কিছু কিছু জ্বালানি রেশনিং করে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেটি চাহিদা অনুপাতে নয়। ৮০ টন লাগলে সেখানে ৫০-৬০ টন পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ২৪ দিনের ফিশিং ট্রিপ ১৮-২০ দিনে নামিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে মোট আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক শওকত কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা শুনেছি। আমরা অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে বলেছি সমস্যাগুলো লিখিতভাবে জানাতে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়েও বৈঠক হয়েছে। এটি আমলে নেওয়া হচ্ছে।’