মিরসরাইয়ের বারইয়ারহাট রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনার চার বছর পর আবার একই উপজেলায় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। এবারের ঘটনাস্থল বারইয়ারহাট রেল ক্রসিং থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দুরে বড়তকিয়া স্টেশন এলাকা। গতকাল শুক্রবার বেলা দেড়টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতী পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দিয়ে এক কিলোমিটার দূরে নিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান ১১ জন। এবারও অভিযোগ উঠেছে গেটম্যানের দায়িত্বে অবহেলার।

গত চার বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রেললাইনের ওপর ট্রেনের সঙ্গে বিভিন্ন গাড়ির ধাক্কা লাগে। অন্তত তিনবার এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩৩ জন।

রেলওয়ের তদন্ত প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন, ট্রেনের যাত্রী ও দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গেটম্যান দায়িত্বশীল হলে এসব দুর্ঘটনা অনেকটাই এড়ানো যেত। গেটম্যানদের অবহেলার কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। আর মানুষের প্রাণহানি হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, লেভেল ক্রসিংয়ে যেসব দুর্ঘটনা ঘটে সেসব ঘটনার তদন্ত করা হয়। তদন্তে কারও অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় শাস্তি নেওয়া হয়। এখন মিরসরাইয়ের বড়তকিয়া স্টেশন এলাকার দুর্ঘটনায় দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে কারও দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বড়তাকিয়া রেলস্টেশনের এক কিলোমিটার উত্তরে গতকাল যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেখানে কোনো গেটম্যান ছিলেন না। সড়কের ওপর লেভেল ক্রসিংয়ে ছিল না সংকেত। প্রতিবন্ধক দণ্ড না ফেলায় কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই রেললাইনের ওপর উঠে যায় মাইক্রোবাসটি। এতে ট্রেনের ধাক্কায় নিহত হন মাইক্রোবাসের ১১ আরোহী। দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনকে গতকাল সন্ধ্যায় আটক করে রেলওয়ে পুলিশ।

গতকাল বেলা তিনটার দিকে ওই ট্রেনের যাত্রী মো. কলিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মাইক্রোবাসটি মহাসড়কের দিকে চলে যাচ্ছিল। বৃষ্টিও পড়ছিল। সড়কের লেভেল ক্রসিংয়ে সিগন্যাল বা প্রতিবন্ধক ছিল না। গেটম্যানও ছিলেন না। ফলে কোনো বাধা ছাড়াই মাইক্রোবাসটি রেললাইনের ওপর উঠে যায়। তখন মাইক্রোবাসে ট্রেনের ধাক্কা লাগে।

এই দুর্ঘটনার আট মাস আগে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর সকালে নগরের খুলশীর ঝাউতলা রেল ক্রসিংয়ে ডেমু ট্রেনের সঙ্গে তিন গাড়ির সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়। আহত হয়েছিলেন অন্তত সাতজন। ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, ডেমু ট্রেন আসার সংকেত পেয়ে রেললাইন থেকে কিছুটা দূরে ছিল বিভিন্ন গাড়ি। কিন্তু ট্রেনটি রেলগেট অতিক্রম করার সময় জিইসি মোড় থেকে আসা দ্রুতগামী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোরিকশা ও একটি টেম্পোকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের ওপর আছড়ে পড়ে।

এ ঘটনায় রেলওয়ের করা কমিটির তদন্তে দেখা গেছে, গেটম্যান আশরাফুল আলমগীর ভূঁইয়ার দায়িত্ব পালনে অবহেলা ছিল। সড়কের এক পাশে লোহার দণ্ডের প্রতিবন্ধকতা ফেলা হলেও অন্য পাশে তা ফেলা হয়নি। যে পাশে ফেলা হয়নি, ওই পাশ দিয়েই বাসটি দ্রুতগতিতে এসেছে। ওই ঘটনায় বাসচালক ও গেটম্যান প্রথমে পালিয়ে গেলেও পরে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

যথাযথভাবে তদারকি না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবহেলার কারণে বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের ঘটনায় প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। যা উদ্বেগজনক। এখানে যারা দায়িত্বশীল তা গেটম্যান বলেন, স্টেশনমাস্টার বলেন, সবারই কোনো না কোনোভাবে দায় আছে। যদি ঠিকভাবে দায়িত্বপালন করতেন তাহলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটত না। রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও দায় নিতে হবে বলে মনে করেন এই প্রকৌশলী।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন