দরিদ্রের তালিকা কেন দরকার

সরকারের কাছে দরিদ্রতালিকা থাকলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সচ্ছলেরা ঢুকে পড়তে পারেন না। এক ব্যক্তির একাধিক কর্মসূচির আওতায় সুফল পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়। আবার তালিকা ধরে সংকটকালে দরিদ্রদের সহায়তা দেওয়া যায়।

করোনাকালে ৫০ লাখ পরিবারকে আড়াই হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা দিতে গিয়ে সরকার দেখে যে তাদের কাছে তালিকা নেই। তড়িঘড়ি করে তালিকা করে ৩৬ লাখ পরিবারকে সহায়তা দেওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে সচ্ছল অনেক পরিবারও ঢুকে যায়।

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে জাতীয় খানা তথ্যভান্ডার প্রকল্পটি যখন নেওয়া হয়, তখন ব্যয় ছিল ৩২৮ কোটি টাকা। সর্বশেষ সংশোধনে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ ৬৮৭ কোটি টাকা। বাকি ৪০ কোটি টাকা সরকারের কোষাগারের।

পরিসংখ্যান বিভাগ জানিয়েছে, প্রকল্পের অধীনে ২০১৭ সালে দেশের সব খানার (৩ কোটি ৬০ লাখ) তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম বা এমআইএস নামের সফটওয়্যারে) সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সফটওয়্যারটি তৈরি হয়নি। সফটওয়্যার তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকে।

পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব শাহনাজ আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাঠ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে আমরা বসে আছি। কিন্তু সেটি সফটওয়্যারে আপলোড (সংরক্ষণ) করতে পারছি না। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর কবে সফটওয়্যার তৈরির কাজটি করতে পারবে, তারও নিশ্চয়তা নেই। তাদের জন্য আমরা দায়ভার নিতে পারি না।’

সফটওয়্যার তৈরির কাজটি পেয়েছে আর্মেনিয়ার কোম্পানি সিনার্জি ইন্টারন্যাশনাল সিস্টেম। ২০১৮ সালে তাদের এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর বলছে, করোনার কারণে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা নিজ দেশে চলে যান বলে কাজ পিছিয়ে যায়। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আতিকুল হক বলেন, পরিসংখ্যান বিভাগ নিজেদের কাজই এখনো শেষ করতে পারেনি। সফটওয়্যারের কাজ চলছে, ৯০ শতাংশ শেষ।

জাতীয় খানা তথ্যভান্ডার প্রকল্পটি ২০১৭ সালেই শেষ হওয়ার কথা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের এক বিভাগ ও এক অধিদপ্তর নিজেদের দায় একে অপরের দিকে ঠেলার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে জনগণের টাকা গচ্চা যেতে বসেছে।

যেনতেনভাবে প্রকল্প শেষের চেষ্টা

২০১৭ সালে ৩ কোটি ৬০ লাখ খানার যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা এখন কম্পিউটারে এন্ট্রি (অন্তর্ভুক্ত) করে রাখছে পরিসংখ্যান বিভাগ। গত ১৬ আগস্ট প্রকল্প কার্যালয় থেকে পরিসংখ্যান বিভাগকে দেওয়া এক চিঠিতে বলা হয়, এখন যে গতিতে কাজ হচ্ছে, তাতে সব খানার তথ্য কম্পিউটারে অন্তর্ভুক্ত করতে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

মানে হলো, এই তথ্য ব্যবহারের উপযোগী করতে আরও প্রায় দুই বছর সময় লাগবে। যদিও গত ৩১ আগস্ট এ প্রকল্পের ‘স্টিয়ারিং কমিটি’র সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রকল্পটির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বরের পর আর বাড়ানো হবে না। এর আগে গত ৮ আগস্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভায় নতুন একটি প্রকল্প নিয়ে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার আলোচনা হয়।

এদিকে প্রকল্পের আওতায় খরচ না হওয়ায় ৯২ কোটি টাকা বিশ্বব্যাংককে ফেরত দিতে ১৫ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) একটি চিঠি পাঠায় পরিসংখ্যান বিভাগ।

পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব শাহনাজ আরেফিন বলেন, ‘প্রকল্পটির মেয়াদ বারবার বাড়িয়ে আমরা বদনামের ভাগিদার হচ্ছি। আর বাড়াতে চাই না।’ ২০১৭ সালে সংগৃহীত তথ্য ২০২৪ সালের মাঝামাঝিতে ব্যবহারের উপযোগী থাকা নিয়ে তিনি বলেন, আগের সংগ্রহ করা তথ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে না।

যদিও আগে সংগৃহীত তথ্য নিয়েই প্রশ্ন আছে। যেমন চট্টগ্রামের একটি উপজেলার সংগৃহীত তথ্য ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর অতিদরিদ্রদের সহায়তা করতে গিয়ে ২০২১ সালে দেখতে পায়, ৭০ শতাংশ খানার তথ্যই ভুল। গত জুনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনেও এই প্রকল্পে ত্রুটিপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, নীতিনির্ধারণী কাজে এত আগের তথ্য ব্যবহার মোটেও উচিত নয়। দেশে করোনা, মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির ওপর চাপ—এসব কারণে মানুষের আর্থিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তিনি বলেন, যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেটা যদি পূরণ না হয়, তাহলে অর্থ ব্যয় করাকে তো অপচয়ই বলতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন