অধ্যাপক সাখাওয়াত আলীর সংস্পর্শে যে-ই এসেছে, তার জীবনেই তিনি আলো জ্বালিয়েছেন

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভার আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। স্মরণসভার শুরুতে শ্রদ্ধা জানিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অ্যালামনাইয়ের সদস্যরা। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান সহজ কথা সহজ করে বলতে পারতেন। তিনি সবকিছুকে উপমা দিয়ে জীবন্ত করে তুলতে পারতেন। তাঁর সংস্পর্শে যে-ই এসেছে, তার জীবনেই তিনি আলো জ্বালিয়েছেন। সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলীকে নিয়ে এভাবে স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর একসময়ের ছাত্রী ও সহকর্মী অধ্যাপক কাবেরী গায়েন।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভায় তাঁর একসময়ের ছাত্রী ও সহকর্মী অধ্যাপক কাবেরী গায়েন। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

সাংবাদিকতার আরেক শিক্ষক অধ্যাপক এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়ার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার দিকপাল যাঁদের বলা হয়, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী। এই মূল্যায়নের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী সাংবাদিকতা করে এসে সাংবাদিকতার শিক্ষক হয়েছিলেন। অভিজ্ঞতা ও তাত্ত্বিক জ্ঞানের সমন্বয়ে তিনি অনন্য হয়ে উঠেছিলেন।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভায় সাংবাদিকতার আরেক শিক্ষক অধ্যাপক এ জে এম শফিউল আলম ভূঁইয়া। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলীর মৃত্যুকে ‘নক্ষত্রের পতন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন সাংবাদিকতার আরেক শিক্ষক অধ্যাপক শেখ আবদুস সালাম। তিনি বলেছেন, ‘স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়, এমন ব্যক্তিত্ব ছিলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। স্যারের মধ্যে রসবোধ ছিল। তিনি সময়, সমাজ ও রাজনীতির মিথস্ক্রিয়া তৈরির অপরূপ শিল্পী ছিলেন।’

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভায় কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মফিজুর রহমান। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও মানুষবান্ধব একজন ব্যক্তি ছিলেন বলে উল্লেখ করেন সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘সাখাওয়াত স্যার সহজ, সাবলীল ও মানবিক মানুষ ছিলেন। সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যে কারও উপকারে লাগা—এ বিষয়টি স্যারের মধ্যে ছিল। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে তিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন আমৃত্যু শিক্ষক।’

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভায় উপস্থিত ব্যক্তিদের একাংশ। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ১৯৭২ সাল থেকে পাঁচ দশকের বেশি সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন। ২০০৮ সালে অবসর নেওয়ার পর তিনি সেখানে পাঁচ বছর সংখ্যাতিরিক্ত (সুপার নিউমারারি) অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি বিভাগটির ‘অনারারি প্রফেসর’ ছিলেন।

বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান ৮৫ বছর বয়সে গত ৯ মার্চ ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম নিয়ে আজ শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে স্মরণসভার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন (ডিইউএমসিজেএএ)। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান এই সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।

এই অধ্যাপকের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে স্মরণসভার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। পরে খালি গলায় ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি গেয়ে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর শুরু হয় স্মৃতিচারণার পর্ব।

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্মৃতিচারণা করেন দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র ছিলেন। তিনি বলেন, ‘সাখাওয়াত স্যার আছেন, থাকবেন। সফল ও সেরা শিক্ষক তিনিই, যিনি শিক্ষার্থীদের জীবনে গল্প তৈরি করতে পারেন। তাঁর তৈরি করা এমন গল্প আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আছে।’

সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শাহানা হুদা রঞ্জনা বলেন, স্যারের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল। তিনি যে আন্তরিকতা, বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান নিয়ে পড়াতেন, তা ভোলার নয়। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন না বলে উল্লেখ করেন তাঁর আরেক ছাত্র তারিকুল ইসলাম।

ডিইউএমসিজেএএর সাংগঠনিক সম্পাদক শাকিল হাসান বলেন, ‘ছাত্র ও শিক্ষকের যে দূরত্ব সচরাচর দেখা যায়, সেখান থেকে স্যার নিজেকে বের করতে পেরেছিলেন। স্যারের স্মৃতি অমলিন থাকবে।’

স্মরণসভায় কথা বলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সহধর্মিণী মালেকা খান। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের স্ত্রী, দুই সন্তান, পুত্রবধূ, জামাতা, নাতিসহ পরিবারের সদস্যরা স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন। প্রয়াত অধ্যাপকের সহধর্মিণী মালেকা খান দাম্পত্যজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ‘তিনি সব সময় আমার ও আমাদের পাশে ছিলেন। আমি নানা সময়ে অনেক ভুল করেছি। এই মানুষটা হাতে ধরে আমার ভুলগুলোকে তুলে ধরে সংশোধন করতেন। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দিকে তাঁর খুব তাগিদ ছিল।’

স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মেয়ে ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন। আজ শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার মিলনায়তনে
ছবি: প্রথম আলো

সাখাওয়াত আলী খানের মেয়ে ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, বাবার মনের বিরাট অংশ জুড়ে ছিল তাঁর ছাত্রছাত্রীরা। এটা তাঁর শেষ দিন পর্যন্ত ছিল। শেষবার অসুস্থ হওয়ার দুদিন আগেও ক্লাস নিয়েছেন। হাসপাতালের আইসিইউতে গেলে আমাকে বলেছিলেন, “তুই এখানে কেন, অফিস নেই?” আরও বলেছিলেন, ক্লাস নিতে পারবেন কি না, তা শিক্ষার্থীদের জানাতে শাওন্তীকে (সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক শাওন্তী হায়দার) ফোন করতে বলেছিলেন। এটা ছিল কাজ ও পেশার প্রতি একজন মানুষের কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার)।’

বাবার কাছ থেকে জীবনে ও পেশায় অনেক বেশি নৈতিক সমর্থন পাওয়ার কথাও উল্লেখ করেন সুমনা শারমীন। তিনি বলেন, ‘বাবা ধৈর্যশীল মানুষ ছিলেন। কখনো উত্তেজিত হতে বা কটুকথা বলতে দেখিনি।’ অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের জন্য সবার কাছে দোয়া চান তিনি।

নানা প্রস্তাব

অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের অবদান, আদর্শ, চিন্তাভাবনা ও দর্শনকে জাগ্রত রাখতে তাঁর স্মরণসভায় একগুচ্ছ প্রস্তাব তুলে ধরেন ছাত্রছাত্রীরা। তাঁরা এই অধ্যাপকের নামে স্মারক বক্তৃতা, বৃত্তি, ট্রাস্ট ফান্ড ও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের প্রস্তাব করেছেন। সেই সঙ্গে প্রয়াত অধ্যাপকের পিএইচডি অভিসন্দর্ভ প্রকাশ এবং বিভিন্ন লেখার সংকলন করার অনুরোধও করেছেন।

স্নাতক-স্নাতকোত্তরে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র ছিলেন, পরে তাঁর তত্ত্বাবধানে পিএইচডি করেছেন অলিউর রহমান। বর্তমানে বেসরকারি গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের এই সহযোগী অধ্যাপক স্মরণসভায় বলেন, সাখাওয়াত আলী খান প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবনে একটা অনন্য পৃথিবী তৈরি করে দিয়েছিলেন। গণমাধ্যম ও যোগাযোগ শিক্ষার শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে দিয়ে গেছেন তিনি। তিনি নৈতিক ও শান্তির জন্য সাংবাদিকতার দর্শন শিখিয়ে গেছেন। সাখাওয়াত আলী খান ছিলেন একটি চলন্ত বিশ্ববিদ্যালয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জীবনে তিনি নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে গেছেন, একটা জীবনদর্শন দিয়ে গেছেন।

এই অধ্যাপকের অবদান, আদর্শ, চিন্তাভাবনা ও দর্শনকে জাগ্রত রাখতে কিছু উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান অলিউর রহমান। এর মধ্যে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে ‘অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান স্মারক বক্তৃতার’ আয়োজনের পাশাপাশি তাঁর নামে একটি গবেষণা বৃত্তি বা ফেলোশিপ চালু, পিস জার্নালিজম নিয়ে সেন্টার প্রতিষ্ঠা এবং সেরা থিসিস পুরস্কার প্রবর্তন করা যায় কি না, তা ভেবে দেখার আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া ডিইউএমসিজেএএর উদ্যোগে প্রয়াত এই অধ্যাপকের নামে ট্রাস্ট ফান্ড, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির পাশাপাশি তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে স্মারকগ্রন্থ ও ডকুমেন্টারি তৈরির কথা বলেন অলিউর রহমান।

১৩ এপ্রিল ‘স্মৃতি তর্পণ’ শিরোনামে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে সাখাওয়াত আলী খানের স্মরণসভার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওন্তী হায়দার।

ডিইউএমসিজেএএর সাধারণ সম্পাদক মীর আত্তাকী মাসরুরুজ্জামান স্মরণসভা সঞ্চালনা করেন। সংগঠনের সভাপতি শামসুল হকের সভাপতিত্বে এতে সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক খান, ডিইউএমসিজেএএর সাবেক সভাপতি স্বপন কুমার দাস, বর্তমান সহসভাপতি মানস ঘোষ, বার্ডের সাবেক কর্মকর্তা খায়রুল কবির প্রমুখ বক্তব্য দেন। প্রয়াত সাখাওয়াত আলী খানের জন্য দোয়ার মধ্য দিয়ে আয়োজন শেষ হয়।