একসময় জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষকদের বেতন ছিল ৬০০ টাকা। বহু বছর পর মহামারির আগে সেটা বেড়ে হয় ১ হাজার ২০০। গত বছর থেকে সেই বেতন হয়েছে ২ হাজার ৪০০। ঊর্ধ্বগতির বাজারে মাত্র ২ হাজার ৪০০ টাকার সম্মানীতে গতি হয় না জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষকদের। টিকে থাকতে টিউশনি করেন তাঁরা।
দেবাশীষ বলেন, ‘আমরা বেতন বাড়ানোর আবেদন করেছি। অন্তত ১০ হাজার টাকা হলে এই বাজারে সেটা যুক্তিপূর্ণ হয়।’

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে গান শেখাচ্ছেন কুড়িগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির সংগীতের শিক্ষক কানাই লাল সরকার। এখনো ২৬ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালিয়ে চলে যান শিল্পকলা একাডেমিতে গান শেখাতে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘একসময় আমি থাকব না। থাকবে কেবল কর্ম। তাই ছেলেমেয়েদের মধ্যে নিজের শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছি যতটা পারি।’

স্বল্প বেতনে চলা কঠিন বলে কানাই লাল শিল্পকলা একাডেমির পাশাপাশি সংগীতেরও টিউশনি করেন। সম্মানীর পরিমাণ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতির জন্য এটা কলঙ্কের ব্যাপার। কালচারের পেছনে সরকার এত টাকা খরচ করে, অথচ আমাদের দিকে নজর দেয় না। এটা দুঃখজনক।’

বাগেরহাট জেলা শিল্পকলা একাডেমির উচ্চাঙ্গ নৃত্যের প্রশিক্ষক মো. মামুনেরও সেই দশা। শিক্ষক হিসেবে টাকার অঙ্ক কাউকে বলেন না। টিকে থাকতে নাচের টিউশনি করতে হয়। শিল্পকলা একাডেমিতে কত্থক শেখানোর পাশাপাশি বাইরেও শেখান তিনি। এত অল্প টাকায় টিকে থাকা দায়। প্রায়ই বিদেশে চলে যেতে বলেন বাড়ির মানুষেরা। মামুন বলেন, ‘নাচ ভালোবাসি বলে এখানে আছি। শিখিয়ে যাচ্ছি, নিজে এখনো শিখে যাচ্ছি। বড় কোনো অনুষ্ঠান হলে ঢাকায় যাই।’

জেলা শিল্পকলা একাডেমির প্রশিক্ষকদের সম্মানী বাড়াতে চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। ১৬ জুলাই সংগীত ঐক্য বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব ও সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। শিগগিরই আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’ ওই অনুষ্ঠানে তিনি জেলার শিল্পীসম্মানী ১০ হাজার ও উপজেলার ৫ হাজারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। প্রশিক্ষকদের সম্মানী বাড়ানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই বাজারে এত কম টাকায় ভালো প্রশিক্ষকেরা কাজ করবে কীভাবে? এদের সম্মানী অবশ্যই বাড়ানো উচিত।’ বেতনের পাশাপাশি প্রশিক্ষকদের প্রশিক্ষণও দরকার বলে মনে করেন এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেন, ‘মফস্‌সলে আগে বেশ দক্ষ সব প্রশিক্ষক পাওয়া যেত। এখন সে রকম পাওয়া যায় না। ঢাকা থেকে ভালো শিল্পী পাঠিয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’

শিল্পকলা একাডেমির আরেক প্রশিক্ষক মাহফুজা খানম থাকেন ঝিনাইদহে। সংগীত পরিবারের মানুষ তিনি। নিজে শিল্পকলা একাডেমিতে ক্লাস নেন। স্বামী বিপ্লব বিশ্বাস শিশু একাডেমিতে শিশুদের তবলা শেখান। তাদের মেয়ে মূর্ছনা বিনতে বিপ্লব ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীতের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। মাহফুজা মনে করেন, একজন শিক্ষক হিসেবে মাসে অন্তত ১০ হাজার টাকা তাঁদের পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় আমরা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি তবলাশিল্পী রঞ্জন ভৌমিককে। মাসে তাঁর বেতন ছিল ৬০০ টাকা। এখন তিনি পাচ্ছেন ২ হাজার ৪০০ টাকা। জীবনে তাঁর আর কোনো প্রাপ্তি নেই। সংগীত ভালোবাসি বলে করে যাচ্ছি। তবে এই টাকায় চলে না। টিউশনির ওপর নির্ভর করতে হয়।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন