জমজমাট আয়োজন, ভরপুর আনন্দ

কিশোর আলো ভালো উদ্যোগের সঙ্গে থাকবে। কিশোরদের উদ্বুদ্ধ করে এমন কথাই বললেন আয়মান সাদিক। গতকাল রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আলোকি কনভেনশন সেন্টারে কিআ কার্নিভ্যালেছবি: খালেদ সরকার

আয়োজন যেমন ছিল জমজমাট, আনন্দও হলো তেমন ভরপুর। ‘সেপনিল নিবেদিত কিআ কার্নিভ্যাল ২০২৬’ কিশোর আলোর পাঠক, স্বেচ্ছাসেবক আর তাদের সঙ্গে আসা অভিভাবকদের দিনভর মাতিয়ে রাখে এক অন্য রকম ভালো লাগায়। দেশের শিশু-কিশোরদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকা কিশোর আলোর (কিআ) ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে রোববার সকাল থেকে বিকেল অবধি এ আয়োজন ছিল গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোডের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে।

সেপনিল নিবেদিত কিআ কার্নিভ্যালে সহযোগিতা করছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। গোল্ড পার্টনার মাইটি চিপস। আয়োজনে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ভেন্যু সহায়তা দিয়েছে আলোকি।

অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে শিশু–কিশোরেরা
ছবি: প্রথম আলো

সকাল নয়টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান। এরপর ‘ধনধান্য পুষ্পভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’ গানটি পরিবেশন করেন সংগীতশিক্ষার প্রতিষ্ঠান সুরবিহার ক্রিয়েটিভ অ্যান্ড পারফরম্যান্স সেন্টারের শিল্পীরা। তাঁদের সঙ্গে সুর মেলান অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

আলোকির বলরুমে হয় আয়োজনের মূল আনুষ্ঠানিকতা। আর দ্বিতীয় তলায় ছিল অভিনয়, আলোকচিত্র ও লেখকের সঙ্গে আড্ডা, মানসিক স্বাস্থ্য, গণিত ও প্রযুক্তিবিষক কর্মশালা। এর বাইরে গ্রিনহাউস মঞ্চে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং কার্টুন ও আঁকিবুঁকি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া আলোকি চত্বরে বসে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান প্রথমাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্টল। প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর সঙ্গে একজন অভিভাবক (বাবা অথবা মা) উৎসবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এবারের আয়োজনে অংশ নিয়েছে দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ও সমসংখ্যক অভিভাবক।

‘নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করা’

পাঠকদের সঙ্গে কার্নিভ্যালের আনন্দ উদ্‌যাপন করতে উপস্থিত হন শিক্ষাবিদ ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে জীবনের নিজস্ব পথ খুঁজে নেওয়া, আনন্দের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং মানবিক মানুষ হওয়ার আহ্বান জানান আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেন, শুধু বই পড়ে নয়, খেলাধুলা, সাঁতার, ব্যায়াম ও নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই একজন মানুষ পূর্ণতা পায়।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, অন্যের চাপিয়ে দেওয়া পথে নয়, বরং নিজের ভেতরের কণ্ঠস্বর শুনে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সফলতা বা ব্যর্থতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের স্বপ্ন ও আনন্দের জায়গাকে অনুসরণ করা।

শিশু–কিশোরদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
ছবি: প্রথম আলো

বক্তব্যের আরেক অংশে এই শিক্ষক ‘দেওয়ার আনন্দের’ গুরুত্ব তুলে ধরেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও বিভিন্ন উদাহরণ দিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, মানুষ শুধু পাওয়ার মধ্যে বড় হয় না, বরং ত্যাগ ও দেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রকৃত মহত্ত্ব অর্জন করে।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘কঠিনকে গ্রহণ করার মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য ও আত্মিক তৃপ্তি লুকিয়ে আছে।’ শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে তিনি আহ্বান জানান, শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্যও কিছু করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।

নিজস্ব স্টাইল গড়ে তুলতে হবে

শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল চিন্তা ও নিজস্ব স্টাইল গড়ে তোলার আহ্বান জানান লেখক ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব। তিনি বলেন, কেউ খারাপ আঁকে না—প্রত্যেকের আঁকার মধ্যেই আলাদা একটি স্টাইল ও আইডিয়া থাকে। আর সেই স্বকীয়তা তুলে আনার দায়িত্ব শিক্ষকের।

শিশুদের জন্য সহজ করে আলোকচিত্র নিয়ে কথা বলেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন।

এরপর শিশুদের অনুপ্রেরণা জোগাতে মঞ্চে ওঠেন টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক। শিশুদের আরও সহজ করে শেখার ওপর জোর দেন তিনি।

কার্নিভ্যালে পরিবেশন করা হয় পাপেট শো
ছবি: প্রথম আলো

ভাষা ও সাহিত্যের আড্ডায় যোগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর শিশুদের বিষয়গুলো বুঝে পাঠ করার ওপর জোর দেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে শিশু–কিশোরদের সচেতনতামূলক অধিবেশন নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক বি এম মইনুল হোসেন। আর সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে অধিবেশন পরিচালনা করেন ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ডিবি সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (দক্ষিণ) ডিভিশন) মো. তরিকুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে জাদু পরিবেশন করেন জাদুশিল্পী রাজীব বসাক। পুতুলনাচ নিয়ে শিশুদের মাতিয়ে রাখে জলপুতুল।

আয়োজনে আরও ছিলেন বিনোদনজগতের জনপ্রিয় তারকারা। তাঁরা অভিনয় নিয়ে শিশুদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্য গান পরিবেশনা করেন আহমেদ হাসান সানি। গানের সঙ্গে নিজের পথচলা নিয়ে কথা বলেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজের ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু।

প্রতিভাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে

কার্নিভ্যালটি দু্ই পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। সকালের পর্বে উদ্বোধনী অধিবেশনে কিশোর আলো সম্পাদক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক বলেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অভিভাবকের স্বপ্নের চেয়ে তার নিজস্ব আগ্রহ ও প্রতিভাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘সমাজে আমরা প্রায়ই এমন ভুল করি, যার ভেতরে একজন শেক্‌সপিয়ার লুকিয়ে আছে, তাকে জোর করে ব্যাংকার বানাতে চাই; যার হওয়ার কথা রবীন্দ্রনাথ, তাকে বানাতে চাই ডাক্তার বা প্রকৌশলী। অথচ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই বিশেষ এক ধরনের প্রতিভা থাকে, যা বিকশিত হয় ভালোবাসা, অনুশীলন ও স্বাধীনতার মাধ্যমে।’

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বই পড়া শিশুদের কল্পনা ও চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে, যা কোনো নাটক বা সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার চেয়ে ভিন্ন। বর্তমান প্রজন্মের জীবনধারা অনেক বদলে গেলেও শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের জন্য প্রযুক্তির পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতা, বইপড়া ও পারিবারিক সংযোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।

বর্তমান প্রজন্মের শিশু-কিশোরেরা ক্রমেই স্ক্রিননির্ভর হয়ে পড়ছে, যা উদ্বেগের কারণ বলে মন্তব্য করেন ইস্পাহানি টি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) ওমর হান্নান। তিনি বলেন, এ বাস্তবতায় শিশুদের জন্য দিনব্যাপী এমন সৃজনশীল ও অংশগ্রহণমূলক আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।

অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী বলেন, যে কাজই করতে চাওয়া হোক না কেন, তার পেছনে নিয়মিত চেষ্টা ও পরিশ্রম থাকতে হবে।

কথা বলছেন অভিনয়শিল্পী আফরান নিশো। পাশে মেহজাবীন চৌধুরী।
ছবি: প্রথম আলো

অভিনেতা আফরান নিশো বলেন, একাগ্রতা ও আত্মবিশ্বাস থাকলে মানুষ নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে।

অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব মায়ের স্মৃতিচারণা করে বক্তব্য দেন।

দুপুরের পর পাঠকের প্রশ্নের মুখোমুখি হয় কিশোর আলো। প্রশ্নের উত্তর দেন কিশোর আলো সম্পাদক আনিসুল হক, জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক আহমাদ মুদ্দাসসের। এরপর শুরু হয় গান পরিবেশনা। এ আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন সংগীতশিল্পী ইমরান মাহমুদুল ও তাঁর গানের দল এবং দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড অ্যাভয়েড রাফা।