দুই শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ, সহায়তায় নাগরিক কমিটি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিলের পর জাতীয় নাগরিক কমিটির সংবাদ সম্মেলন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অভিযোগ দায়েরকারীরাছবি: শুভ্রকান্তি দাশ

জাতীয় নাগরিক কমিটির তত্ত্বাবধানে ও আইনি সহায়তায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করেছেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত দুই শিক্ষার্থীর বাবা।

একটি অভিযোগে আসামি হিসেবে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আর অজ্ঞাত আসামি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১০০ থেকে ১৫০ সদস্য। আরেকটি অভিযোগে আসামি হিসেবে ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। একটিতে ১ নম্বর আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আরেকটিতে ১ নম্বর আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের যেসব পরিবার এখনো আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়নি কিংবা বিভিন্ন কারণে অভিযোগ দায়ের করতে পারেনি, তাদের ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করতে আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক কমিটি। এ ক্ষেত্রে তারা অভিযোগ তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও বিচার শুরু হওয়ার পর আইনি কাঠামোর মধ্য থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আইনিপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে নাগরিক কমিটির তত্ত্বাবধান ও আইনি সহায়তায় ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দুটি দাখিল করা হয়। পরে নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক কমিটির সদস্যদের সঙ্গে অভিযোগ দায়েরকারী দুই বাবা ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব ও ডাকসুর সাবেক সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নাগরিক কমিটির প্রাথমিক কাজ হিসেবে ঘোষিত আট দফা কর্মসূচির দ্বিতীয় দফা ছিল ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নেওয়া। এর বাস্তবায়নের জন্য নাগরিক কমিটি ছাত্র-নাগরিকের অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে। ছাত্র-নাগরিকের অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের শিকার দুজনের পরিবার আজ নাগরিক কমিটির মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করেছে। এই দুই পরিবারকে অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়ায় আইনি সহায়তা করেছে নাগরিক কমিটি।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে গত ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি পালিত হয়। কর্মসূচি চলাকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালীর কাজলা পেট্রলপাম্পের পাশের পকেট ফটকে ফ্যাসিবাদের দোসরদের গুলিতে নিহত হন দনিয়া কলেজের বিএ (পাস) কোর্সের শিক্ষার্থী সাকিব হাসান। আর গত ৪ আগস্ট লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনি এলাকায় গুলিতে নিহত হন চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ওসমান পাটওয়ারী ওরফে ওসমান গণি। এই দুই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আজ নাগরিক কমিটির তত্ত্বাবধানে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ৩ (২) (এ), ৩ (২) (গ), ৩ (২) (এইচ), ৪ (১) ও ৪ (২) ধারা অনুযায়ী গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। সাকিব হাসানের বাবা মো. মর্তুজা আলম ও ওসমান গণির বাবা মো. আবদুর রহমান পৃথকভাবে অভিযোগ দুটি দায়ের করেছেন। যেসব শহীদের পরিবার এখনো আইনি লড়াইয়ে যুক্ত হয়নি কিংবা বিভিন্ন কারণে অভিযোগ দায়ের করতে পারেনি, তাদের ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ দাখিল করতে আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক কমিটি।

আখতার হোসেন বলেন, তাঁরা মামলার তদন্তের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবেন। বিচার শুরু হওয়ার পর আইনি কাঠামোর মধ্য থেকে শহীদ পরিবারকে আইনিপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন। এ ছাড়া এই অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের পক্ষে মামলা দায়ের, পরিচালনা ও বিচারপ্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার মাধ্যমে সার্বিক সহযোগিতা করবেন।

নাগরিক কমিটির সদস্য বাড়ল

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের এক দফা (ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ১৩ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ৫৫ সদস্যের জাতীয় নাগরিক কমিটি আত্মপ্রকাশ করে। আইনি সহায়তার জন্য আজ সাত আইনজীবীকে এই কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২।

নতুন সাত সদস্যকে সংবাদ সম্মেলনে পরিচয় করিয়ে দেন আখতার হোসেন। তাঁরা হলেন মুস্তাফিজুর রহমান, জহিরুল ইসলাম, মনজিলা ঝুমা, হুমায়রা নূর, সাকিল আহমাদ, ফাতিমা আক্তার ও প্রিয়াসী চাকমা।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে আখতার হোসেন বলেন, কেবল জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত-আহত যোদ্ধাদেরই নয়, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলের বিভিন্ন সময় যাঁরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেসব শিক্ষার্থী অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাঁদের ন্যায়বিচার পাওয়ার লক্ষ্যে নাগরিক কমিটি ‘প্রো-বোনো সার্ভিস’ (বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা) দেবে। তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রাথমিক সার্বিক আইনি সহায়তা দেবে কমিটি। এই লক্ষ্যে নতুন করে সাতজনকে কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে।

যাঁরা নাগরিক কমিটির সহায়তায় অভিযোগ করতে চান, তাঁদের মনজিলা ঝুমা (মুঠোফোন নম্বর: ০১৭৯৫৫২১৪১৭) ও হুমায়রা নূরের (মুঠোফোন নম্বর: ০১৭৬৫৩৩৩১১৯) সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে নাগরিক কমিটি।

বিচার চাইলেন দুই বাবা

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন নিহত সাকিব হাসানের বাবা মর্তুজা আলম। তিনি বলেন, যে পুলিশ সদস্যরা তাঁর ছেলেকে হত্যা করেছেন, যাঁরা তাঁদের নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি সরকারের কাছে তাঁদের বিচার চান। অধিকার চাইতে যাওয়ায় তাঁর ছেলেকে মেরে ফেলা হয়েছে। তিনি ছেলের হত্যার বিচার চান।

নিহত ওসমান গণির বাবা আবদুর রহমান বলেন, তাঁর ছেলে (ওসমান) ৪ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টার দিকে তাঁকে ফোন দেয়। জানায়, সে ছাত্র আন্দোলনে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। তাই ছেলেকে আন্দোলনে যেতে তিনি না করেন। ছেলে বলে, তাঁর ছাত্র ভাইয়েরা আন্দোলনে মারা যাচ্ছে। সে মিছিলে যাবেই। পরে তিনি ফোনেই ছেলেকে বিদায় জানান। বিকেল চারটা থেকে সাড়ে চারটার দিকে তাঁর ছেলে গুলিবিদ্ধ হয়। পরে ফোনে তিনি খবর পান, ওসমান মারা গেছে। বাড়ি গিয়ে দেখেন, অ্যাম্বুলেন্সে ছেলের নিথর দেহ পড়ে আছে। তিনি তাঁর ছেলে হত্যার বিচার চান। হত্যাকারী আওয়ামী সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ বিচার কামনা করছেন তিনি।

আসামি যাঁরা

নিহত ওসমান গণির বাবা আবদুর রহমানের দাখিল করা অভিযোগে ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা এ কে এম সালাহ উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া মোহাম্মদ গোলাম ফারুক, লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হুমায়ুন কবির, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ আহাম্মদ, সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হাসান।

আসামি হিসেবে আরও আছেন লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল করিম, জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব, ৪ নম্বর আলাইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান, আমান উল্লাহপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল হুদা, একই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আরিফুর রহমান, যুবলীগ নেতা আবু শাহাজাহান, আরজু, লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা আনোয়ার সাদাত শিবলু, সৈয়দ এস এম বিপ্লব ও হুমায়ুন কবির।

অন্যদিকে নিহত সাকিব হাসানের বাবা মর্তুজা আলমের দাখিল করা অভিযোগে আসামি হিসেবে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল–মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক প্রধান হারুন অর রশীদ, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অজ্ঞাতনামা ১০০ থেকে ১৫০ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে।