এ বছর ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৫১৭ জন। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৭৫ জন। এই ৭৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রথম তিন দিনের মধ্যে মারা গেছেন ৪৮ জন বা ৬৪ শতাংশ। হাসপাতালে ভর্তির চার থেকে ছয় দিনের মধ্যে মারা গেছেন ১৮ জন। বাকি ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ৭ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে। তবে গতকাল সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ডেঙ্গুতে আরও আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৮৩। তবে সর্বশেষ আটজনের মৃত্যুর স্থান, বয়স ও লিঙ্গ পরিচয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ও বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক আহমেদুল কবীর বলেন, ‘জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে গুরুত্ব দেন না। পরিস্থিতি বেশ খারাপ হওয়ার পরেই কেউ কেউ হাসপাতালে আসছেন। এই বিলম্বের কারণে হাসপাতাল আসার পরপরই মৃত্যুর হার বেশি।’

ডেঙ্গু পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য তুলে ধরার সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক ইকরামুল হক বলেন, এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত ৭৫ জনের মধ্যে নারী ৪৬ জন এবং পুরুষ ২৯ জন। অর্থাৎ পুরুষের দ্বিগুণের বেশি মৃত্যু হয়েছে নারীর।

নারীর বেশি মৃত্যু হওয়ার সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নাম প্রকাশে একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, নারীর অসুস্থতা পরিবারে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে পুরুষ একা চিকিৎসকের কাছে বা হাসপাতালে যেতে পারেন, অনেক ক্ষেত্রে নারী তা পারেন না। চিকিৎসাসেবা পেতে নারীর বিলম্ব হয়। এই সমস্যা পুরোনো।

মৃত্যুর তথ্য দেওয়ার সময় ইকরামুল হক বলেন, শিশুদের মধ্যেও মৃত্যু বেশি দেখা যাচ্ছে। এ বছর ১৮ বছরের কম বয়সী ২৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা শিশু হাসপাতালেই মৃত্যু হয়েছে সাত শিশুর।

কোথায় সংক্রমণ ও মৃত্যু বেশি
অন্য বছরগুলোতে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঢাকা মহানগরের বাইরে খুব একটা দেখা যায়নি। এ বছর ইতিমধ্যে প্রায় ৫০টি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা মহানগরের পর এ বছর ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে। অন্যদিকে জেলাভিত্তিক হিসাবে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি কক্সবাজারে। গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৬ হাজার ৭৬২ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাসপাতালে রোগী আসার হার সবচেয়ে বেশি মিরপুর ও উত্তরা থেকে। এরপর বেশি রোগী আসছেন মুগদা থেকে। রোগীর হারে তৃতীয় স্থানে আছে কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী ও ধানমন্ডি।

দেশের কতটি হাসপাতালে বা কোন কোন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে, তার তথ্য গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়নি। তবে ইতিমধ্যে কোন কোন হাসপাতালে রোগীর মৃত্যু হয়েছে, সেই তথ্য জানানো হয়। এ রকম সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ২৫টি। তালিকায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে। এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এই দুটি প্রতিষ্ঠানে সাতজন করে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে পাঁচজনের।

এখনো কেন এমন পরিস্থিতি
২০০০ সালে দেশে বড় আকারে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। প্রতিবছরই মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগে থাকে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ডেঙ্গুর চারটি ধরন আছে: ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। ২০১৮ সালের পর ডেঙ্গুর ডেন-১ ধরনে মানুষের আক্রান্ত হতে দেখা যায়নি। ২০২১ সালে সব মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল ডেন-৩ ধরনে। এ বছর ডেন-৪ ধরনের প্রকোপ বেশি। আবার ডেন-৩ ও ডেন-১ ধরনেও মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ডেঙ্গুর তিনটি ধরন দেশে এখন সক্রিয়। এটি ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি হওয়ার একটি কারণ হতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কুষ্ঠ রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ব্যবস্থাপক অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এডিস মশা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। এটা মশা বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ।

করণীয়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক আহমেদুল কবীর বলেন, মানুষকে সচেতন আচরণ করতে হবে, নিজের বাড়িতে এডিস মশা না থাকার সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। আর জ্বরে আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বা হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

মশা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এডিশ মশা এখন সারা দেশে। সিটি করপোরেশন মশা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ও নিধন করতে পারবে না। সব মহানগরসহ সারা দেশের মশা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পৃথক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মশা মারার জন্য ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে। ভারতে এমন প্রতিষ্ঠান আছে।