নির্বাচন বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইভিএমে ভোট হলেই তা শতভাগ সুষ্ঠু হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। ভোটে এই যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক আছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটসঙ্গী কয়েকটি দল শুধু ইভিএমে ভোট করার পক্ষে। অন্যদিকে বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বেশির ভাগ দলের মধ্যে ইভিএম নিয়ে সন্দেহ, অবিশ্বাস কাজ করছে।

আবার ভোটারদের অনেকেই এই যন্ত্রে ভোট দিতে এখনো স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। অনেক ভোটারের প্রযুক্তিভীতি আছে—এটি ইসিও স্বীকার করে নিয়েছে। এর বাইরে ইভিএমে ভোট দিতে গেলে আঙুলের ছাপ না মেলা, কারিগরি ত্রুটির কারণে ভোট গ্রহণে দেরি হওয়ার মতো বিড়ম্বনাও রয়েছে। বিপরীতে কাগজের ব্যালটে ভোট নিয়ে কেউ আপত্তি তোলেনি। এত সব নেতিবাচক দিক উপেক্ষা করে অর্থনীতির সংকটকালে ইসি কেন ইভিএমে ভোট গ্রহণে মরিয়া, কেন বিপুল ব্যয়ে ইভিএম কেনা হচ্ছে—এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইভিএমের পেছনে বিপুল ব্যয়ের বিষয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক, কারচুপিমুক্ত নির্বাচন চান তাঁরা। ইভিএমে কারচুপির সুযোগ নেই, এ কারণে আওয়ামী লীগ ইভিএমে ভোটের প্রস্তাব দিয়েছে। ইভিএম কেনার বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে। ইসি সরকারের কাছে বরাদ্দ চেয়েছে। সব বিবেচনা করে যতটুকু সম্ভব সরকার দেবে।

শুরু থেকেই বিতর্ক

২০১০ সালে দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএমের ব্যবহার শুরু হয়। এর প্রসার শুরু হয় ২০১৮ সালে। শুরু থেকেই এই যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আছে। আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন ইসি গত জুলাইয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ডেকেছিল। সেখানে বেশির ভাগ দল ইভিএম নিয়ে সন্দেহ, সংশয় প্রকাশ করে ভোটে এই যন্ত্র ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে। কিন্তু ইসি সর্বোচ্চ ১৫০টি আসনে ইভিএমে ভোট নেওয়ার বিষয়ে অনড়। এখন ইসির কাছে দেড় লাখ ইভিএম আছে। ১৫০ আসনে ভোট নিতে প্রয়োজন আরও ২ লাখ ইভিএম। এ জন্য ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রতিটির ইভিএমের একক দর ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।

দেশের রিজার্ভের ওপর যখন চাপ, জ্বালানি ঘাটতিতে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যখন নাজুক, তখন এই যন্ত্রের পেছনে বড় অঙ্কের ডলার ব্যয় করতে হবে। ইসি সূত্র জানায়, ইভিএম সরবরাহ করবে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। তারা যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করবে। প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে যন্ত্রাংশ আমদানিতে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়াবে।

আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কত টাকা খরচ হবে, তার হিসাব এখনো করেনি ইসি সচিবালয়। ভোটের যে ব্যয় হয়, তার বড় অংশ যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বাচন পরিচালনায়। ব্যালট ছাপা ও আনুষঙ্গিক খরচ খুব বেশি হয় না। ব্যালটে হোক আর ইভিএমে নির্বাচন হোক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বাচন পরিচালনার খরচ একই থাকবে। ইভিএমে ভোট হলে যন্ত্রের দামের কারণে খরচ অনেক বেড়ে যায়। এই যন্ত্র ব্যবহার করা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বা নির্বাচন পরিচালনা খাতে খরচ কমবে না; বরং নির্বাচন কর্মকর্তাদের ইভিএমের প্রশিক্ষণ, ভোটারদের জন্য ‘মক ভোটিংয়ে’ বাড়তি ব্যয় হয়।

ইসি সূত্র জানায়, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ভোটের জন্য মোট ৭০০ কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করেছিল ইসি। এর মধ্যে ৪০০ কোটি টাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য এবং ৩০০ কোটি টাকা নির্বাচন পরিচালনায় ব্যয় ধরা হয়েছিল। পরে ব্যয় আরও কিছুটা বেড়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের পেছনে মোট কত ব্যয় হয়েছিল, সে হিসাব সুনির্দিষ্টভাবে ইসি সচিবালয় থেকে পাওয়া যায়নি। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ৪০ হাজার ১৮৩টি। ভোটকক্ষ ছিল ২ লাখ ৭ হাজার ৩১২টি। ভোটার ছিলেন ১০ কোটি ৪২ লাখের কিছু বেশি। আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র হতে পারে ৪২ থেকে ৪৪ হাজার। আর ভোটকক্ষ হতে পারে আড়াই লাখের মতো।

ভোটারের সংখ্যা হবে ১২ কোটির কাছাকাছি। সব মিলিয়ে ভোটের খরচ বাড়বে। দশম সংসদ নির্বাচনে ভোটের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। (কিন্তু ১৫৩ আসনে ভোটের প্রয়োজন হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৪৭টি আসনে ব্যয় হয়েছিল ২৬৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।) দশম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের জন্য মোট বরাদ্দের চেয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে বরাদ্দ বেড়েছিল প্রায় ২৯ শতাংশ। যদি আগামী নির্বাচন ব্যালটে করা হয় এবং বরাদ্দ গতবারের চেয়ে দ্বিগুণ করা হলেও খরচ হবে দেড় হাজার কোটি টাকার কম।

দেশে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএমের ব্যবহার শুরু করেছিল এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। ওই কমিশনের সদস্য সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, ইভিএমে ভালো নির্বাচন হয়। কিন্তু ইভিএম এখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কিত বিষয়। তা ছাড়া এখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে। এ সময়ে ইভিএমের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা যৌক্তিক হবে না। ইভিএমের পক্ষে থাকলেও সব দিক বিবেচনায় এবার বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করতে যাওয়া যথাযথ হবে না বলেই তিনি মনে করেন।

ইভিএম সংরক্ষণেও ব্যয়

ইসি সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইভিএমে জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও উপনির্বাচন হয়েছে ২১টি। বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মিলিয়ে মোট ৮৯৩টি নির্বাচন হয়েছে ইভিএমে।

ইসি এক দিনে সারা দেশে ১৫০টি সংসদীয় আসনে ইভিএমে ভোট নেওয়ার মতো সক্ষমতা রাখে কি না, সেটাও প্রশ্ন। কারণ, ইসির ওই অভিজ্ঞতা এখনো অর্জিত হয়নি। গত চার বছরে যতগুলো ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে, দেড় শ আসনে কেন্দ্র হবে তার চেয়ে অনেক বেশি। ইসি সূত্র জানায়, ১৫০টি সংসদীয় আসনে ইভিএমে ভোট করতে হলে ভোটকেন্দ্র হবে ২৩ হাজারের বেশি।

অর্থাৎ গত চার বছরে ইসি যতটি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করেছে, জাতীয় নির্বাচনে তার চেয়ে বেশিসংখ্যক ভোটকেন্দ্রে এই যন্ত্রের ব্যবহার হবে। ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা বাদে ২৯ হাজার ১২০ জন কর্মকর্তা প্রয়োজন হবে ইভিএমের জন্য। বিপুলসংখ্যক ভোটারকে ইভিএমের সঙ্গে পরিচিত করার চ্যালেঞ্জও আছে।

ইসি সূত্র জানায়, কে এম নূরুল হুদার আমলে (গত নির্বাচন কমিশন) ইসি সাধারণ ব্যালট ও ইভিএমে ভোটের একটি তুলনামূলক খরচের হিসাবের খসড়া করেছিল। তাতে ইভিএমের মোট আয়ুষ্কাল বিবেচনায় নিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি সংসদীয় আসনে গড়ে দেড় কোটি টাকার বেশি খরচ হবে ইভিএম ভোটে। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে ইভিএম রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়।

ইভিএম নিয়ে ইসির বক্তব্য

আগামী নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে প্রথম আলোর প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মো. আহসান হাবিব খান বলেন, ‘আজ অবধি নির্বাচন কমিশন প্রায় ৯০০ নির্বাচন ইভিএমে পরিচালনা করেছে এবং তাতে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল পেয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তাই আমরা একটি ভালো এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ইভিএমে করার জন্য প্রস্তাব করেছি। একটা সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মূল্য আর্থিক অঙ্কে কত হবে, সেটা সরাসরি বলা যাবে না।

কিন্তু গুড গভর্ন্যান্সের বিবেচনায় একটা সুষ্ঠু ও সব মহলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল্য অপরিসীম হতে পারে। ইভিএমে নির্বাচন নিয়ে কোন খাতে কত ব্যয় হবে, তার চেয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি একটি সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখা ও সুষ্ঠু নির্বাচন-পরবর্তী সুফল দেশের প্রতিটি সেক্টর ভোগ করবে, সেই দিকে। আমরা চাই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সুশাসনের সুবাতাস বইতে শুরু করুক।’

আহসান হাবিব বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য কখনোই অতিরিক্ত ব্যয় করা নয়। প্রয়োজনীয়তা যাচাই সাপেক্ষে অবশ্যই দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা হবে। সেই সঙ্গে উপযুক্ত এবং যথার্থভাবে ব্যয় সংকোচন নীতি প্রয়োগে কমিশন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকবে। কেননা দেশের জনগণের কাছে কমিশনের দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমাদের পাঠানো ইভিএমে নির্বাচন আয়োজন করার প্রস্তাবের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হবে, সেটার যথার্থতা ও যৌক্তিকতা বিবেচনা করবে প্ল্যানিং কমিশন এবং অর্থ বিভাগ। তারা পরিস্থিতি বিবেচনায় যা চূড়ান্ত অনুমোদন করবে, নির্বাচন কমিশন সেটাই অনুসরণ করবে, এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।’

উন্নত দেশগুলোও ইভিএম থেকে সরে আসছে

বিশিষ্ট নাগরিকদের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও ভোটারদের আস্থাহীনতার কারণে পৃথিবীর অনেক দেশ এখন ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসছে। পৃথিবীর ১৭৮টির মধ্যে বর্তমানে শুধু ১৩টি দেশ তাদের সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করছে। প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক উন্নত জার্মানি, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসও ইভিএম ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ করার চেষ্টা করছে। সেখানে ১ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে ইভিএম কিনতে। যদি এটা প্রমাণিত হতো যে ইভিএমে ভোট হলেই তা সুষ্ঠু হবে, তাহলে একটি বিষয় ছিল।

কিন্তু এটি পরীক্ষিত নয়; বরং ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আছে। ইভিএমে ভোটের ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে, এমন আশঙ্কা আছে। ফলে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিপুল ব্যয়ে এই দুর্বল যন্ত্র কেনা কার স্বার্থে, এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ইভিএম কেনা এবং ইভিএমে ভোট করার পদক্ষেপ থেকে সরে আসাই হবে ইসির সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।