দেশে প্রতিবছর ৮ থেকে ১১ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০ হাজার। দেশে প্রতি ৯ জনের একজন থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক।
অন্যান্য দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে উন্নতি করতে পারেনি। এই রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি। এ জন্য বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার ব্যাপারে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর মালিবাগে থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন বক্তারা। বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন সেমিনারটি আয়োজন করে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য, ‘আর নয় আড়ালে: শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এটা সত্যিকার অর্থে খুবই দুর্ভাগ্যজনক, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে; এখন পর্যন্ত আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজে সরকারিভাবে থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারিনি।’
থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে গণমাধ্যম সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলেন মন্ত্রী। তিনি কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আহ্বান জানান।
এর আগে মন্ত্রী ৫০ শয্যাবিশিষ্ট থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ঘুরে দেখেন। এ সময় তিনি থ্যালাসেমিয়া রোগী ও অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং রোগীদের চিকিৎসার খোঁজ নেন।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সমাজে অনেক কুসংস্কার আছে। অনেকে ভাবেন, থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে বিয়ে হবে না। এ জন্য পরীক্ষাও করাতে চান না। কিন্তু এমন ধারণা ঠিক নয়। ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে যদি একজন বাহক হন, সে ক্ষেত্রে সমস্যা নেই। পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে দুজনেই যেন বাহক না হন। বক্তারা এই সচেতনতা সৃষ্টিতে ধর্মীয় নেতাদের প্রতি এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মনজুর মোরশেদ। তিনি বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। মনজুর মোরশেদ জানান, দেশে রোগনির্ণয়ের ক্ষেত্রে নানা রকম সীমাবদ্ধতা আছে। আবার থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক। সারা দেশের মানুষকে থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা পেতে ঢাকায় ছুটতে হয়। তিনি থ্যালাসেমিয়া ব্যবস্থাপনায় একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরির তাগিদ দেন।
দেশে থ্যালাসেমিয়া ব্যবস্থাপনায় রক্ত পরিসঞ্চালনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে চিকিৎসক মনজুর মোরশেদ উল্লেখ করেন। মনজুর মোরশেদ বলেন, ‘দেশে রক্ত সঞ্চালনব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। উন্নত দেশগুলোতে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ রক্তদান স্বেচ্ছায় করা হয়। যেটা বাংলাদেশে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। বাকিটুকু রোগীর আত্মীয়স্বজন অথবা যাঁরা রক্ত বিক্রি করেন অথবা বন্ধুবান্ধব—এঁদের থেকে জোগাড় হয়।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আবুল কালাম আজাদ থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসাকে অন্তত বিভাগীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর দাবি জানান। এ সময় তিনি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সরকারি চাকরিতে কোটাসুবিধা দিতে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানান।
সেমিনারে বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউছুফ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস অ্যান্ড ভ্যাট উইংয়ের সাবেক সদস্য এস এম হুমায়ূন কবীর এবং চিফ মেডিক্যাল অফিসার সাজিয়া ইসলাম। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাসুমা রহমান অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠান শেষে থ্যালাসেমিয়া দিবস উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের হাতে সার্টিফিকেট ও পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। দিনের শুরুতে সকাল পৌনে আটটায় সচেতনতামূলক র্যালি মালিবাগ থেকে শুরু হয়ে শান্তিনগর মোড় ঘুরে থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে এসে শেষ হয়।