উন্নত বিশ্বের মতো দেশেও একই গাইডলাইন মেনে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের চিকিৎসা হচ্ছে

এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়ছবি: প্রথম আলো

ক্যানসার জয় করার লড়াইয়ে সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তকরণ ও আধুনিক চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মার্চ মাসকে বিশ্বব্যাপী ‘কোলোরেক্টাল ক্যানসার সচেতনতা মাস’ হিসেবে পালন করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের মধ্যে এই ক্যানসারের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা আমাদের বর্তমান লাইফস্টাইল ও খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করছেন।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এসকেএফ অনকোলজির আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় ‘বিশ্বমানের ক্যানসার চিকিৎসা এখন বাংলাদেশে’ শীর্ষক বিশেষ অনলাইন আলোচনা। এতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো তুলে ধরেন উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক। নাসিহা তাহসিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচারিত হয় প্রথম আলো এবং এসকেএফ অনকোলজির ফেসবুক পেজে।

কোলোরেক্টাল ক্যানসারের ঝুঁকি ও কারণ

ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক জানান, বাংলাদেশে এ ক্যানসার প্রবণতা বাড়ার পেছনে আমাদের জীবনযাত্রার পরিবর্তন বা ‘ওয়েস্টার্নাইজেশন’ বড় ভূমিকা রাখছে। মানুষ এখন আগের চেয়ে বেশি অলস জীবন যাপন করে এবং কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস কমে গেছে। খাদ্যাভ্যাসে শাকসবজি ও ফলমূলের পরিবর্তে ফাস্টফুড, ফ্রাইড ফুড ও অতিরিক্ত রেড মিট বা লাল মাংস খাওয়ার প্রবণতা এই ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া স্থূলতা বা অবেসিটি এবং ধূমপানের অভ্যাসের সঙ্গেও এই ক্যানসারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বংশগত বা জেনেটিক কারণেও এই রোগ হতে পারে, বিশেষ করে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

লক্ষণ ও শনাক্তকরণ পদ্ধতি

মলাশয় ক্যানসারের লক্ষণগুলো সম্পর্কে ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক বলেন, মলত্যাগের অভ্যাসে হঠাৎ পরিবর্তন আসা যেমন কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য, আবার কখনো পাতলা পায়খানা হওয়া এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া মলের সঙ্গে তাজা রক্ত যাওয়া, পেটে বা তলপেটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া এবং শরীর ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া বা রক্তশূন্যতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। রোগ শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে কোলোনোস্কপি এবং বায়োপসিকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়। বায়োপসি পরীক্ষার মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায় যে টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট বা ক্যানসার কি না। এর পাশাপাশি সিটিস্ক্যান বা এমআরআইয়ের মাধ্যমে রোগের স্টেজ বা ব্যাপ্তি নির্ণয় করা হয়।

কোলোরেক্টাল ক্যানসার সচেতনতা ও প্রতিকার নিয়ে আলোচনা করেন ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক
ছবি: প্রথম আলো

চিকিৎসা ও বাংলাদেশের সক্ষমতা

বাংলাদেশে কোলোরেক্টাল ক্যানসারের আধুনিক সব চিকিৎসা এখন সহজলভ্য। এ বিষয়ে ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক বলেন, ক্যানসার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। রোগের স্টেজ অনুযায়ী সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বয়ে চিকিৎসা করা হয়। বর্তমানে ইমিউনোথেরাপি ও টার্গেটেড থেরাপির মতো উন্নত প্রযুক্তিও বাংলাদেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, উন্নত বিশ্বে যে প্রটোকল মেনে চিকিৎসা করা হয়, বাংলাদেশেও একই গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়।

প্রতিরোধ ও ফলোআপ ব্যবস্থাপনা

ক্যানসার প্রতিরোধে লাইফস্টাইল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক বলেন, নিয়মিত শরীরচর্চা, প্রতিদিন পর্যাপ্ত শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ করার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব। চিকিৎসা–পরবর্তী জীবন সম্পর্কে ডা. মেহদী ফারুক প্রতীক জানান, সুস্থ হওয়ার পর নিয়মিত ফলোআপে থাকা জরুরি। সাধারণত প্রথম দুই বছর প্রতি তিন মাস পরপর এবং পরবর্তী সময়ে ছয় মাস বা এক বছর অন্তর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয়।