পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবর থেকে  চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে উখিয়ার একাধিক আশ্রয়শিবিরে আরসার সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনীর সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় অন্তত ২৩ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১১ জন রোহিঙ্গা মাঝি ও পাঁচজন আরসার সদস্য। বাকিরা সাধারণ রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গা নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, আরসা ঠেকানোর নেতৃত্বে আছে মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী আরেক সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আশ্রয়শিবিরে মিয়ানমার থেকে মাদক (ইয়াবা ও আইস) সরবরাহের অন্যতম নিয়ন্ত্রক নবী গ্রুপের প্রধান নবী হোসেন। এই নবী হোসেন নিয়ন্ত্রণ করেন ছোট ৯টি গোষ্ঠী। এগুলো হচ্ছে মাস্টার মুন্না, মো. আসাদ, মো. জুবাইর, মো. হাকিম, মো. জাবু, মো. ইসলাম, মো. মুমিন, মো. জাকির ও শফিউল্লাহ বাহিনী। গ্রুপগুলোর সদস্যরাই কয়েকটি আশ্রয়শিবিরে আরসার প্রধান কমান্ডার আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনিসহ ২৮ সদস্যকে গ্রেপ্তারের দাবিতে পোস্টার সাঁটিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩ আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে, দেশটির সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে।

উখিয়ার একাধিক আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালের দিকে পুরো আশ্রয়শিবিরের নিয়ন্ত্রণ ছিল আরসার হাতে। সাধারণ রোহিঙ্গারাও আরসাকে নানাভাবে সহযোগিতা দিত। কিন্তু রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে বিপাকে পড়ে আরসা। এর ফলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সমর্থন হারাতে থাকে তারা। এখন আরসা আশ্রয়শিবিরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চাইছে। কিন্তু আরএসও, নবী হোসেন গ্রুপসহ ১১টি রোহিঙ্গা বাহিনী এককাট্টা হওয়ায় আরসা কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা মাঝি সালামত উল্লাহ বলেন, আরসার দ্বিতীয় ভুলটি ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তাকে হত্যা করা। এর আগে তারা আশ্রয়শিবিরে এপিবিএনকে টার্গেট করেছিল। গত বছরের ১৪ নভেম্বর তুমব্রু সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে আরসা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার রিজওয়ান রুশদী। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের সদস্য সোহেল বড়ুয়া। এ ঘটনায় করা মামলায় আরসা প্রধান আতাউল্লাহ আম্মার জুনুনিসহ ৩১ জনকে আসামি করে মামলা হয়। এ ছাড়া গত নভেম্বর থেকে আরসা প্রধান আতাউল্লাহসহ তাঁর সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে আরও তিনটি হত্যা মামলা হয়।

রোহিঙ্গা নেতারা জানান, ছয় মাস আগে উখিয়ার আশ্রয়শিবির থেকে বিতাড়িত হয়ে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরে আস্তানা গড়ে আরসার দুই শতাধিক সদস্য। এখান থেকেও আরসাকে উৎখাতে ১৮ জানুয়ারির সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ ঘটনার পর একজন রোহিঙ্গা নিহত ও শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরের সব কটি (৬৩০টির বেশি) ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা গৃহহীন হয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে এসে তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নেয়। গতকাল সোমবার বিকেল পর্যন্ত গৃহহীন এই রোহিঙ্গাদের কোথায় সরিয়ে নেওয়া হবে, তার সিদ্ধান্ত হয়নি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয়দের তথ্যমতে, শূন্যরেখার আশ্রয়শিবিরটি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার পর আরসা কমান্ডার আতাউল্লাহসহ গোষ্ঠীর সদস্যরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ওয়ালিডং পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তাঁরা যেন বাংলাদেশের দিকে ঢুকতে না পারে, সে জন্য শূন্যরেখার আরেকটি পাহাড়ে অবস্থান নিয়েছে আরএসওর সদস্যরা। দুই পক্ষের মধ্যে যেকোনো সময় সংঘর্ষ লেগে যেতে পারে।

কুতুপালং আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা জালাল আহমদ বলেন, আরসাপ্রধানের বিভিন্ন ভিডিও বার্তা ও সংঘর্ষের খবরাখবর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। তবে সতর্ক অবস্থানে আছে অন্য গ্রুপগুলোও।

আশ্রয়শিবিরগুলোতে আরসা কমান্ডার নেই জানিয়ে ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক ও পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, আরসা কমান্ডারসহ সন্ত্রাসীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ মুহূর্তে আরসা কমন্ডারের অবস্থান কোথায়, সেটা জানার চেষ্টা চলছে।