যুদ্ধের কারণে সংকট
জরুরিভাবে ৩০০ কোটি ডলার ঋণ চায় সরকার
চার মাস জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সার বাড়তি দামে আমদানিতে দরকার ৩০০ কোটি ডলার।
ভর্তুকির জন্য বাড়তি লাগবে ৩৮,৫৪২ কোটি টাকা।
২০২২ সালে এমন সংকটের পর দারিদ্র্য বেড়েছিল ৯ শতাংশের বেশি।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে গেছে। বাড়তি দামে এসব পণ্য আমদানিতে চার মাসে প্রয়োজন ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। আবার ভর্তুকি দিতে লাগবে সাড়ে ৩৮ হাজার কোটি টাকা।
সরকার এই চাপ সামাল দিতে ৩০০ কোটি ডলার (প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা) ঋণের খোঁজ করছে। গত মার্চ থেকে আগামী জুন সময়ের জন্য বাজেট সহায়তা হিসেবে উন্নয়ন–সহযোগীদের কাছ থেকে এই ঋণ নিতে চায় সরকার। ঋণ পাওয়া যায় কি না, তা আলোচনা করে দেখতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চিঠি দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামষ্টিক অর্থনীতি শাখা।
চিঠির সঙ্গে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো হয়েছে একটি অবস্থানপত্র। সেখানে জরুরি ঋণসহায়তার জন্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর তৈরি হওয়া চাপ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। অবস্থানপত্রে ঋণ তিনভাবে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়। প্রথমত, এই ঋণ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ধরে রাখা এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্য আমদানি নিশ্চিতে সহায়তা করবে। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সহায়তা দিতে ভূমিকা রাখবে। তৃতীয়ত, দেশে জ্বালানি তেল, গ্যাস, সার ইত্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে তা ব্যয় করা যাবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৩১ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরবেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় অবস্থানপত্রে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য চাপের মুখে পড়েছে। এই ঋণসহায়তা জরুরি প্রয়োজন মেটানো ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে দরকার।
বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও ইআরডির শীর্ষস্থানীয় কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কারণ, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ১৪ কর্মকর্তা ১৩ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বসন্তকালীন সভায় যোগ দিতে গেছেন। এই সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আইএমএফের কাছে বাড়তি ঋণ চাওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ৩১ মার্চ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরবেন।
২০২২ সালের পর আবার সংকট
যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ বিঘ্নিত হলে এবং বিশ্ববাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিপাকে পড়ে বাংলাদেশ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরপরই বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছিল।
বাড়তি দরে আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত দ্রুত কমতে থাকে। একটি পর্যায়ে তা ৪ হাজার ৮০০ কোটি (৪৮ বিলিয়ন) ডলার থেকে নেমে আসে ২ হাজার কোটি (২০ বিলিয়ন) ডলারের নিচে। অন্যদিকে ৮৬ টাকার ডলারের দাম ১২০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। এর জন্য দায়ী করা হয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অব্যবস্থাপনাকে।
জ্বালানি তেল ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ার চাপ সাধারণ মানুষের ওপর দিয়ে দেয় তখনকার সরকার। দফায় দফায় বাড়ানো হয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি তেল ও সারের দাম। কিন্তু মজুরি মূল্যস্ফীতি অনুযায়ী বাড়েনি।
অর্থনীতির এই পরিস্থিতি বিপুলসংখ্যক মানুষকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দেয়। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) গত বছরের আগস্টে প্রকাশিত গবেষণায় জানায়, তিন বছরে দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এর ১০ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যেটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। বাংলাদেশ সময় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি এখনো খোলেনি। অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। তিনি বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল করার জন্য ঋণের সুদের হার বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। বাড়তে থাকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। গত ফেব্রুয়ারি মাসে বৈদেশিক মুদ্রার মোট মজুত সাড়ে ৩ হাজার কোটি (৩৫ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়ে যায়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। এর ১০ দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আক্রমণ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যেটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ।
বাংলাদেশ সময় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি এখনো খোলেনি। অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। আবার যুদ্ধবিরতি শেষ হলেও শিগগিরই জ্বালানির দাম আগের পর্যায়ে যাবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়ে নতুন সরকার জরুরি ঋণের খোঁজে নামল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চ-জুন (২০২৬) সময়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে ভর্তুকি দাঁড়াবে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। বাজেটে ভর্তুকি বরাদ্দ আছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
আমদানির চাপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৮৩৫ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোলিয়াম পণ্য অর্থাৎ জ্বালানি আমদানির ব্যয় ৫১৪ কোটি ডলার। সার আমদানিতে লেগেছে আরও ২৬২ কোটি ডলার। বাসসের একটি খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩৮৮ কোটি ডলার।
জ্বালানির দাম বাড়লেই বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়। অর্থ মন্ত্রণালয় অবস্থানপত্রে বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ২৫০ শতাংশ, এলএনজি ১০০ শতাংশ এবং সারের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ-জুন সময়ে যেখানে জ্বালানি ও সার আমদানিতে ৩০১ কোটি ডলার লেগেছিল, সেখানে চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে ৫৫৮ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
অবস্থানপত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত পরিস্থিতিও তুলে ধরেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ হাজার কোটি (৩০ বিলিয়ন) ডলারের বেশি থাকলেও মার্চে তা কমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি (২৯ বিলিয়ন) ডলারে নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, এই হিসাব আইএমএফ নির্দেশিত পদ্ধতিতে করা, যা বিপি ৬ নামে পরিচিত।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশ উন্নয়ন–সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেটসহায়তা চাইছে। তাই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়।জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ
ভর্তুকির চাপ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চ-জুন (২০২৬) সময়ে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারে ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা বাড়তি ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে ভর্তুকি দাঁড়াবে ৯৭ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা। বাজেটে ভর্তুকি বরাদ্দ আছে ৫৯ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্ববাজারে বাড়লেও এপ্রিলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি সরকার। তবে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ে ৯ এপ্রিল একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার প্রধান অর্থমন্ত্রী।
ঋণের জন্য যোগাযোগ
ইআরডি সূত্র জানিয়েছে, জরুরি ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। অতীতেও বাজেট সহায়তা নেওয়া হয়েছিল, তবে সে সময় উন্নয়ন–সহযোগীরা নানা সংস্কারের শর্ত দিয়েছিল। এর কিছু বাস্তবায়িত হলেও কিছু হয়নি। ফলে নতুন ঋণ সহায়তা পেতে সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
অন্যদিকে আইএমএফের মতো সংস্থাগুলো জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের মতো খাতে সবার জন্য ভর্তুকি দেওয়ার বিরোধী। এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয় অবস্থানপত্রে বলেছে, এই ভর্তুকি হবে স্বল্পমেয়াদি এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমুখী। পাশাপাশি রাজস্ব বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বাড়ছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩৫১ কোটি মার্কিন ডলার। এই অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনেক দেশ উন্নয়ন–সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেটসহায়তা চাইছে। তাই বাংলাদেশের এই উদ্যোগ অস্বাভাবিক নয়। তবে তিনি মনে করেন, উন্নয়ন–সহযোগীরা জানতে চাইবে সরকার কী ধরনের নীতি পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশে জ্বালানির দাম কেন সমন্বয় করা হয়নি।