সড়কে ২০২৫–এ নিহত ৭ হাজার, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪০%: রোড সেফটি ফাউন্ডেশন
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়েছে। বেড়েছে আহত মানুষের সংখ্যাও। ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৭ হাজার ৩৫৯ জন। আহত হয়েছেন আরও ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। এসব দুর্ঘটনায় ৯৬২ জন নারী ও ১ হাজার ৮টি শিশু নিহত হয়েছেন।
এসব তথ্য দিয়েছে সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কাজ করা সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি আজ শনিবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর–রুনি মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে সড়কে এই প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে ৭ হাজার ৫৮৪টি দুর্ঘটনায়। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ১৩২টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪৯ জন। আহত হয়েছেন ১২৩ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৩৪ জন। আর রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে ৫১৯টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪৭৮ এবং আহত হয়েছেন ১৫২ জন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দেশের ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
২০২৪ সালে দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৬ হাজার ৯২৭টি। এতে নিহত হন ৭ হাজার ২৯৪ জন এবং আহত হন ১২ হাজার ১৯ জন।
সংস্থাটি জানায়, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে মোটরসাইকেলে। ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ৬৭২ জন। যথাক্রমে এই সংখ্যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং মোট নিহতের ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষ নিহত হয়েছেন ৫ হাজার ৭২৩ জন, যা মোট নিহতের প্রায় ৭৮ শতাংশ।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার কারণ উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশ মোটরসাইকেল। আর মোটরসাইকেলের চালকদের বড় অংশ কিশোর ও যুবক। তাঁরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজেরা দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অন্যদেরও আক্রান্ত করছেন।
অধ্যাপক এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের সড়ক ও সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার কাজে বিআরটিএ, বিআরটিসি, ডিটিসিএ, বাংলাদেশ পুলিশ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান জড়িত। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। জবাবদিহি নেই বললেই চলে। এসব কারণেই সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। দুর্ঘটনাও কমছে না। বছরের পর বছর শুধু বৈঠক, কর্মশালা, কমিটি গঠন ও সুপারিশমালা তৈরির মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ১৩টি কারণ উল্লেখ করে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ওভার লোড, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা ও বেতন-কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, তরুণ-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, জনসাধারণের মধ্যে ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা এবং বিআরটিএর সক্ষমতা ও জবাবদিহির ঘাটতি ইত্যাদি।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২১টি সুপারিশ উল্লেখ করে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি এবং ডিটিসিএ সংস্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বৃদ্ধি ও চালকদের বেতন, কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্যসেবাসহ পেশাগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, মোটরসাইকেলের গতি নিয়ন্ত্রণে ইন্টারনেট অব থিং (আইওটি) প্রযুক্তি ব্যবহার ইত্যাদি।
সংবাদ সম্মেলনে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ জাহাঙ্গীর বলেন, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাংলাদেশে এখনো উপযুক্ত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে না। ফলে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা উন্নত বিশ্ব থেকে অনেক পিছিয়ে আছি।
আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সড়ক দুর্ঘটনায় রোধে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয় কি না, সেটা যাচাই করার অনুরোধ জানান সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান কামরান উল বাছেত। তিনি গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমানের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন সংস্থার ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক হাসিনা বেগম, যুগ্ম সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম, মাহমুদ রিয়াজ, কোষাধ্যক্ষ কাজি মাকসুদুর রহমান, নির্বাহী সদস্য আমিনুর রহিম ও গবেষণা সমন্বয়ক পাহাড়ী ভট্টাচার্য।