শ্রমিক অধিকারের অনেক প্রশ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে: অধ্যাপক এম এম আকাশ

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত মঞ্চে বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ। আগারগাঁও, ঢাকা। ১ মে ২০২৬ছবি: প্রথম আলো।

শ্রমিকদের দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে মহান মে দিবসের অর্জন এসেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেছেন, বাস্তবে শ্রমিক অধিকারের অনেক প্রশ্ন এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।

মহান মে দিবস উপলক্ষে শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উন্মুক্ত মঞ্চে বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে অধ্যাপক এম এম আকাশ এ কথা বলেন।

আলোচনায় অধ্যাপক এম এম আকাশ বাংলাদেশের পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্পদের কেন্দ্রীভূতীকরণ ও শ্রমিক বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় ছোট পুঁজিপতিরা ক্রমে হারিয়ে গিয়ে শ্রমিকে পরিণত হয় এবং অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে সম্পদ জমা হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, একসময় পাকিস্তানে যেমন ‘২২ পরিবার’ অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক ছিল, তেমনি বাংলাদেশেও বড় করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান শ্রমকাঠামোর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ‘লোভী পুঁজিপতি’ শ্রেণির সমালোচনা করে অর্থনীতির এই অধ্যাপক বলেন, অনেকেই উৎপাদনে বিনিয়োগ না করে অর্থ পাচারে জড়িত। ফলে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে এবং শ্রমিকদের দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হচ্ছে। বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণখেলাপি প্রবণতা ও অর্থ পাচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

শ্রমিক শোষণের প্রসঙ্গ টেনে এম এম আকাশ বলেন, একসময় শ্রমিকদের ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হতো। ন্যূনতম মজুরি এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো, যাতে তারা শুধু টিকে থাকতে পারেন। বর্তমানেও শ্রমবাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে শ্রমিকেরা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শ্রম আইন ও সংস্কার প্রসঙ্গে এম এম আকাশ বলেন, শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশে শ্রমিকদের কিছু দাবি অন্তর্ভুক্ত হলেও পরবর্তী সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি। নতুন শ্রম আইনেও শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

চীন, ভিয়েতনাম ও কিউবার উদাহরণ দিয়ে এম এম আকাশ বলেন, এসব দেশে ন্যূনতম আয় ও কম কর্মঘণ্টার মাধ্যমে শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করার চেষ্টা দেখা যায়। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে কাজের সময় কমিয়ে মানবিক উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর দিকেও তারা এগোচ্ছে।

ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে দরিদ্রের ন্যূনতম চাহিদা পূরণ, শ্রমের ন্যায্য মূল্য এবং দক্ষতার স্বীকৃতির ওপর জোর দিয়ে এম এম আকাশ বলেন, মানসিক ও শারীরিক সব শ্রমিকের যৌথ প্রচেষ্টায়ই সভ্যতা গড়ে উঠেছে। এই যৌথ মালিকানা ও মানবিক বণ্টনের সমাজ গড়তে পারলেই মে দিবসের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি শিল্পী কাজী মিজানুর রহমান।

ঝর্ণা আলমগীর ও আলেকজেন্ডার আজাদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে দলীয় সংগীত পরিবেশন করে ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী, ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী, বহ্নিশিখা, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠী, আনন্দন, ভিন্নধারা, উঠোন, সুরতাল, সমস্বর, পঞ্চভাস্কর ও সপ্তরেখা শিল্পগোষ্ঠী। একক আবৃত্তি করেন নায়লা তারাননুম চৌধুরী কাকলি, মাহফুজা আক্তার মিরা ও দিলসাদ জাহান পিউলী। বিদ্রোহের গান পরিবেশন করেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। একক সংগীত পরিবেশন করেন ফকির সিরাজ, সমর বড়ুয়া, প্রলয় সাহা, এস এম মেজবাহ, আবিদা রহমান সেতু ও অলোক দাশগুপ্ত। শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছিল গেন্ডারিয়া কিশলয় কচি-কাঁচার মেলা।