সাতক্ষীরার আমকাহিনি
মোস্তাফিজুর রহমান একজন আমচাষি। সাতক্ষীরার বড় আমচাষিদের একজন তিনি। গত বছরের জুন মাসে জেলার কয়েকটি এলাকার ৩০টি বাগান কিনেছিলেন। প্রায় দুই হাজার আমগাছের সেই বাগান কিনতে খরচ করেছিলেন প্রায় ৩৫ লাখ টাকা। এরপর বছরজুড়ে পরিচর্যা করতে ব্যয় হয়েছে আরও ২৫ লাখ টাকা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চালতেতলা এলাকার বাগানের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মোস্তাফিজুর রহমানের। গাছের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আম চাষ শুধু ব্যবসা না ভাই, এটা একটা আবেগ। একটা গাছকে সারা বছর সন্তানের মতো লালন করতে হয়।’
কথা বলতে বলতে মোস্তাফিজুর রহমান হাত বাড়িয়ে একটি আম ছুঁয়ে দেখলেন। চোখেমুখে তখন অদ্ভুত এক তৃপ্তি।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম জেলা সাতক্ষীরা এখন শুধু চিংড়ি বা সুন্দরবনের জেলা নয়, ধীরে ধীরে এটি পরিচিতি পেয়েছে দেশের ‘আগাম আমের রাজধানী’ হিসেবে। উপকূলীয় আবহাওয়া, তুলনামূলক কম শীত, দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কৃষকদের আধুনিক পরিচর্যার কারণে দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে আম পাকে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে। ফলে মৌসুমের শুরুতেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজার দখল করে নেয় সাতক্ষীরার আম। কৃষি বিভাগের হিসাব বলছে, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আম বেচাকেনার সম্ভাবনা রয়েছে।
অনেক আগে থেকেই সাতক্ষীরার গেরস্তবাড়িতে বড় বড় আমের বাগান ছিল। তবে বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ শুরু হয় মূলত নব্বইয়ের দশকের পর। সাতক্ষীরা সদর, কালীগঞ্জ, দেবহাটা, তালা ও কলারোয়া উপজেলায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ছোট-বড় অসংখ্য আমবাগান। শ্যামনগর ও আশাশুনিতে তুলনামূলক কম আম চাষ হয়। এর কারণ অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও চিংড়ি চাষের বিস্তার।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ২০০৫ সালের পর পরিকল্পিতভাবে আমবাগান সম্প্রসারণ শুরু হয়। ২০১০ সালের পর থেকে সাতক্ষীরার আগাম আম দেশের বাজারে সাড়া ফেলতে শুরু করে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের আগেই ব্যবসায়ীরা সাতক্ষীরামুখী হতে শুরু করেন। ২০১২-১৩ সালের পর থেকেই ‘আমের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকে জেলাটি।
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। জেলায় রয়েছে ৫ হাজার ২৯৯টি বাগান। ৪৫ হাজার ৭৫০ জন কৃষক সরাসরি আম চাষের সঙ্গে যুক্ত। সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদিত হয় সাতক্ষীরা সদর উপজেলায়।
জেলায় প্রতিবছরই বাড়ছে আম চাষ। সাতক্ষীরা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম বলছিলেন, আম চাষ বাড়লেও অন্য ফসলের ক্ষতি হচ্ছে না; বরং আম চাষের জমিতে ধান, মুগডাল, মাষকলাই ছাড়াও আদা, হলুদ, কচুসহ অন্যান্য ফসলও উৎপাদন করেন কৃষকেরা।
কেন আগে পাকে সাতক্ষীরার আম
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরায় শীত কম পড়ে ও ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকেই তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এতে আমগাছে দ্রুত মুকুল আসে এবং ফল দ্রুত পরিপক্ব হয়। এ ছাড়া জেলার দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি, দীর্ঘ সময় সূর্যালোক পাওয়া এবং হালকা লবণাক্ত পরিবেশও আমের দ্রুত পরিপক্বতায় ভূমিকা রাখে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলের তুলনায় সাতক্ষীরার আম দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে বাজারে আসে।
আমচাষি সোনা চক্রবর্তী ও লিয়াকত হোসেন জানান, আম পাড়া শেষ হলেই শুরু হয় নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি। জুলাই মাসে গাছ পরিষ্কার করা হয়। এরপর গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগ ও মাটি ব্যবস্থাপনা করা হয়। সেপ্টেম্বরে আবারও সার ব্যবহার করা হয়। নভেম্বর থেকে শুরু হয় রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম। ছত্রাক ও পোকার আক্রমণ ঠেকাতে নিয়মিত বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়। জানুয়ারিতে মুকুল আসার পর বিশেষ পরিচর্যা দিতে হয়। মার্চ থেকে আম পাড়া পর্যন্ত ফল ঝরা রোধ, সেচ ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি গুরুত্ব দেন চাষিরা।
৫ মে থেকে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, গোলাপখাস, বোম্বাই ও স্থানীয় বিভিন্ন জাতের আম বাজারে এসেছে। সবচেয়ে সুস্বাদু হিমসাগর আম এসেছে ১৫ মে থেকে। ল্যাংড়া আম পাওয়া যাবে ২৭ মে থেকে। আর ৫ জুন থেকে বাজারে আসবে আম্রপালি ও মল্লিকা।
সুস্বাদু আর কম আঁশের জন্য জনপ্রিয়
সাতক্ষীরায় উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য আমের মধ্যে রয়েছে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বোম্বাই, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, আশ্বিনা, রুপালি ও মল্লিকা। এ জেলার আমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রাকৃতিক সুগন্ধ, অধিক রস, কম আঁশ এবং মিষ্টতা। বিশেষ করে হিমসাগর, গোবিন্দভোগ ও গোপালভোগ জাতের আম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়।
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো সাতক্ষীরা থেকে ২১ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৫ সালে রপ্তানি হয় ৭২ মেট্রিক টন আম। চলতি বছর রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০০ মেট্রিক টন।
বর্তমানে ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যে যাচ্ছে সাতক্ষীরার আম।
এবার ফলন হয়েছে আশানুরূপ। গাছে গাছে ঝুলছে থোকা থোকা আম। তবু চাষিদের কপালে চিন্তার ভাঁজও আছে। কারণ, ঈদের আগে সবারই টাকার প্রয়োজন। তাই বাজারে একসঙ্গে উঠছে প্রচুর আম। দাম কিছুটা কমে গেছে।
তবে হতাশ নন মোস্তাফিজুর রহমানের মতো আমচাষিরা। তাঁদের বিশ্বাস, ঈদের পর আবার চাঙা হবে বাজার।