ছাত্র–জনতার আন্দোলনের তীব্রতা কিছুটা কমে আসায় ১০ দিন বন্ধ থাকার পর ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই সকালে সব ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ সচল করে সরকার। তখনো ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো বন্ধ ছিল।
সেদিন (২৮ জুলাই) রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের বাধ্য করে আন্দোলন প্রত্যাহারের একটি ভিডিও বার্তা বানিয়ে গণমাধ্যমে পাঠিয়েছিল পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ থাকলেও তা অনলাইন, টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ভেবেছিল, সেই ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ছাত্র–জনতার আন্দোলন থেমে যাবে। কিন্তু ঘটনাটি বুমেরাং হয়েছিল। সমন্বয়কদের ডিবি কার্যালয়ে আটকে রেখে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিতে বাধ্য করায় ছাত্র–জনতা আরও ক্ষুব্ধ হন।
ওই ভিডিওতে দেখা যায়, ডিবি কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন ছয়জন সমন্বয়ক বসে আছেন। এর মধ্যে নাহিদ ইসলাম (বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক) একটি লিখিত বক্তব্য পাঠ করছেন। একটি কাগজ দেখে নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন ও তার প্রেক্ষিতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকে অপ্রত্যাশিতভাবে আহত এবং নিহত হয়েছেন। তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় অগ্নিসংযোগসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটেছে। আমরা এ সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত বিচারের দাবি জানাচ্ছি। আমাদের প্রধান দাবি ছিল কোটার যৌক্তিক সংস্কার, যা ইতিমধ্যে সরকার পূরণ করেছে। এখন শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানাই। সার্বিক স্বার্থে আমরা এই মুহূর্ত থেকে আমাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করছি।’
ডিবির পাঠানো ভিডিওতে দেখা যায়, নাহিদ ইসলামের পাশে বসে আছেন বাকি পাঁচ সমন্বয়ক সারজিস আলম (এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক), হাসনাত আবদুল্লাহ (এনসিপির সংসদ সদস্য), আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা), নুসরাত তাবাসসুম (এনসিপির সংসদ সদস্য) ও আবু বাকের মজুমদার (বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক)।
ডিবি কার্যালয় থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে সমন্বয়কদের ভিডিও বার্তা প্রচারের পর সে রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দেন। তাতে বলা হয়, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডিবি কার্যালয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয়জন সমন্বয়ককে দিয়ে জোরপূর্বক ডিবি কার্যালয় থেকে যে বিবৃতি আদায় করা হয়েছে, তা দেশের ছাত্রসমাজ প্রত্যাখ্যান করে।
ছয়জন ডিবি হেফাজতে থাকায় তখন অন্য সমন্বয়কেরা নেতৃত্ব দিতে থাকেন। অন্যদিকে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘাত-সংঘর্ষে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবনে দেখা করেন। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নিহত আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন, মা মনোয়ারা বেগমসহ ৩৪ জনের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে প্রধানমন্ত্রী সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থসহায়তা দেন।
একই দিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল পরিদর্শনে যান। পরে রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (সাবেক বিএসএমএমইউ) কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহতদের দেখতে যান। শেখ হাসিনা নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে এবং হাসপাতালে আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে গেলেও একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করে যাচ্ছিল। ১২ দিনে (১৬–২৮ জুলাই) ঢাকাসহ ১৮টি জেলায় কমপক্ষে ২৫৩ শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। আন্দোলন ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় করা মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।