দেশে বাড়ছে মশা, বাড়ছে অসুখ, তাপ–বৃষ্টির হেরফেরসহ আরও কী কী কারণ

উচ্চ মৃত্যুহার ও নতুন ভাইরাসের শঙ্কা। গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি মশার বংশবিস্তারে সহায়ক। দীর্ঘায়িত হচ্ছে প্রজনন মৌসুম।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শয্যায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক শিশু। গত বছরের জুলাই মাসে তোলাছবি: সৌরভ দাশ

এক সপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বরে ভোগার পর অবশেষে ম্যালেরিয়ার কাছে হার মানতে হয়েছে ১০ বছর বয়সী সুদীপ্তা চাকমাকে। গত বছরের জুলাই মাসে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে তার মৃত্যু হয়। দীর্ঘ ৯ বছর পর ম্যালেরিয়ায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটল এ জেলায়। শুধু সুদীপ্তাই নয়, গত বছর এ জেলায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে মশাবাহিত রোগ ম্যালেরিয়ায়।

জেলা স্বাস্থ্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ এলাকায় ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক মৃত্যুগুলো স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য নতুন করে ভীতি ও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তা গত ৯ বছরের পরিসংখ্যানের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রাণঘাতী এই রোগ মূলত দেশের পার্বত্য অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। যদিও আগের বছরের তুলনায় সামগ্রিক প্রকোপ কিছুটা কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু যে হারে এটি নির্মূল হওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা হচ্ছে না; বরং কোনো কোনো এলাকায় হঠাৎ রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।

দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা ও চিকুনগুনিয়া—এই চার প্রধান মশাবাহিত রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও জিকা ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।

মশার বংশবৃদ্ধির সঙ্গে তাপমাত্রার পরিবর্তনের একটি গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ুর এ পরিবর্তনগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট। এ প্রাকৃতিক পরিবর্তন মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে ত্বরান্বিত হলেও আশু ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ কম। কিন্তু যেসব বিষয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বা হাত রয়েছে, যেমন মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, দক্ষ নগর ব্যবস্থাপনা, সঠিক নগর-পরিকল্পনা এবং জনস্বাস্থ্য কাঠামোর আধুনিকায়ন, সেগুলো বাস্তবায়নে বেশ ঘাটতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

ম্যালেরিয়া মূলত ‘অ্যানোফিলিস’-জাতীয় মশার কামড়ে ছড়ায়। তবে বর্তমানে কেবল অ্যানোফিলিস নয়, আরও নানা প্রজাতির মশার বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের প্রকোপও। গবেষকেরা দেখছেন, মশা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা ও চিকুনগুনিয়া—এই চার প্রধান মশাবাহিত রোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও জিকা ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ২০২৪ সাল থেকে নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে দেশে নতুন নতুন প্রজাতির মশা ও অজানা মশাবাহিত রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। বর্তমানে দেশে কিউলেক্স মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, কিউলেক্স মশার কামড়েও ফাইলেরিয়া ও জাপানি এনসেফালাইটিসের মতো রোগ হতে পারে। বাংলাদেশে এই দুই রোগের বিস্তার এখন পর্যন্ত কম হলেও বিশেষজ্ঞরা মোটেও শঙ্কামুক্ত নন, বিশেষ করে জাপানি এনসেফালাইটিসে মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।

ঢাকা নগরীর মশা বৃদ্ধির একটি বড় কারণ ময়লা–আবর্জনার বিস্তার। সবুজবাগ এলাকা থেকে গত মার্চ মাসে তোলা
ছবি: দীপু মালাকার

একসময় যা ছিল নিতান্তই শহরের অসুখ, তা এখন দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। এর বড় উদাহরণ ডেঙ্গু। এটি এখন দেশজুড়ে সারা বছরের একটি সাধারণ ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে চিকুনগুনিয়ার ভৌগোলিক বিস্তৃতিও বাড়ছে। অথচ শহুরে এসব রোগ সামলাতে নগরাঞ্চলে সামান্য যেটুকু চিকিৎসা পরিকাঠামো আছে, প্রত্যন্ত এলাকায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছে।

এ পরিস্থিতির সুযোগে মশা নিধনকারী কয়েল, স্প্রেসহ নানা সামগ্রীর রমরমা ব্যবসা চলছে। বাজারে পাওয়া এসব সামগ্রী কতটুকু মানসম্পন্ন বা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, মশাবাহিত রোগগুলো আগামী দিনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমানের নগর ব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ সমস্যার দিকে খুব বেশি গুরুত্ব বা দৃষ্টি দেওয়া হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতির সুযোগে মশা নিধনকারী কয়েল, স্প্রেসহ নানা সামগ্রীর রমরমা ব্যবসা চলছে। বাজারে পাওয়া এসব সামগ্রী কতটুকু মানসম্পন্ন বা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। তদারকির অভাব সত্ত্বেও ব্যক্তিগত সুরক্ষা ও রোগের ভয়ে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে এসব সামগ্রী কিনছেন।

তাপ বৃদ্ধি আর জলবায়ুর পরিবর্তন মশার আদর্শ পরিবেশ

গত দুই দশকে বাংলাদেশে বৃষ্টির ধরনে আমূল পরিবর্তন এসেছে। বর্ষার সময় কম বৃষ্টি এবং বর্ষার পর অতিবৃষ্টি মশার বংশবৃদ্ধিতে ব্যাপক সহায়তা করছে। এ ছাড়া গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার প্রজনন হার বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারসপেকটিভ-এ প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং আর্দ্রতার ওঠানামা মশার জীবনচক্র ও ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, গত ৩০ বছরে বাংলাদেশের বার্ষিক গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার ছিল প্রতিবছর ০.০১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিশেষ করে শীতকাল আগের চেয়ে উষ্ণ হচ্ছে, যা মশার বংশবিস্তারের মৌসুমকে দীর্ঘায়িত করছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, মশার প্রজননের জন্য ২৬ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আদর্শ। বাংলাদেশের বর্তমান গড় তাপমাত্রা (২৫ থেকে ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মশা ও পরজীবী উভয়ের জন্যই অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও দীর্ঘ সময় ধরে থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

‘ডিসপারিটিজ ইন রিস্কস অব ম্যালেরিয়া অ্যাসোসিয়েটেড উইথ ক্লাইমেটিক ভ্যারিয়াবিলিটি অ্যামাং উইমেন, চিলড্রেন অ্যান্ড এলডারলি ইন দ্য চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন পার্বত্য অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে মশার প্রজনন ও জীবাণুর বিকাশ দ্রুত হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় শিশু ও বয়স্কদের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে, আর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সময় নারীদের মধ্যে ম্যালেরিয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল হেলথ পারসপেকটিভ-এ প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং আর্দ্রতার ওঠানামা মশার জীবনচক্র ও ভাইরাস সংক্রমণের ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

পুরোনো সমস্যা ম্যালেরিয়া

২০২৫ সালে দেশে ম্যালেরিয়ায় মোট ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১৬ সালের পর দেশে আর কোনো বছরে ম্যালেরিয়ায় এত বেশি মৃত্যু দেখা যায়নি। ১৬ জনের মধ্যে ৯ জনই মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্য। মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুসংখ্যা কিছুটা কমলেও রোহিঙ্গাদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ এবং মৃত্যুহার স্বাস্থ্যকর্মীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে।

বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া একসময় বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা ছিল। তবে গত দেড় দশকে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার অনেক কমে এসেছিল। ২০১০ সালে যেখানে ৫৫ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন, ২০১২ সালে তা কমে ৬ হাজারে নেমে এসেছিল। তবে এই সাফল্যের ধারা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি; ২০২৩ সালে ১৬ হাজার ৫৬৭ জন আক্রান্ত হন এবং ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ হাজার ১৫৬ জনে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় এখনো এই রোগের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।

অধ্যাপক ফয়েজ মনে করেন, মিয়ানমারে যদি ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার বিস্তার ঘটে, তবে তা বাংলাদেশের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। ১৩ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থান এবং সীমান্ত দিয়ে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ম্যালেরিয়া পরজীবীকে সহজেই সীমান্ত পার করে দিচ্ছে।
ম্যালেরিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম এ ফয়েজ
ছবি: সংগৃহীত

সরকার ২০২৪-২০৩০ সালের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। বর্তমানে ৫১টি জেলাকে ম্যালেরিয়ামুক্ত বলে দাবি করা হয়। তবে খ্যাতিমান ম্যালেরিয়া বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম এ ফয়েজ মনে করেন, এই দাবির পেছনে জোরালো কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক বা তথ্যভিত্তিক প্রমাণ নেই। এটি মূলত আন্তর্জাতিক তহবিলের জন্য আবেদনের সময় করা একটি দাবি।

অধ্যাপক ফয়েজ জানান, কোনো এলাকাকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করতে হলে সেখানে টানা তিন বছর স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ শূন্য থাকতে হবে এবং তা প্রমাণ করার জন্য নিয়মিত মাইক্রোস্কোপি ও আরডিটি পরীক্ষা প্রয়োজন। অথচ অনেক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই পরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই।

বর্তমানে ম্যালেরিয়া শনাক্তকরণে বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্যালসিপারাম প্যারাসাইটের জিনগত পরিবর্তন (ডিলিশন)। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে আরডিটি পরীক্ষায় ম্যালেরিয়া ধরা পড়ছে না।

রাঙামাটিতে গত বছর সুদীপ্তা চাকমা নামের যে মেয়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল, তার পরপর দুবার আরডিটি পরীক্ষা নেগেটিভ এসেছিল বলে জানান জেলার সিভিল সার্জন নূয়েন খীসা। তিনি বলেন, তৃতীয়বার পজিটিভ হলে মেয়েটির অবস্থা সঙিন হয়ে উঠেছিল।

ঢাকায় ও বান্দরবানে এমন কিছু রোগী পাওয়া গেছে যাদের আরডিটি ফলাফল নেগেটিভ হলেও মাইক্রোস্কোপিতে ম্যালেরিয়া পজিটিভ ধরা পড়েছে। প্রান্তিক পর্যায়ে যেখানে মাইক্রোস্কোপির সুবিধা নেই, সেখানে এই জিনগত পরিবর্তনের কারণে রোগনির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো বর্তমানে ম্যালেরিয়ার জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে মিয়ানমারের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার কারণে সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি আরও বেড়েছে। অধ্যাপক ফয়েজ মনে করেন, মিয়ানমারে যদি ওষুধ-প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার বিস্তার ঘটে, তবে তা বাংলাদেশের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। ১৩ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অবস্থান এবং সীমান্ত দিয়ে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ম্যালেরিয়া পরজীবীকে সহজেই সীমান্ত পার করে দিচ্ছে।

ডেঙ্গু এখন সারা বছরের অসুখ

দেশে ২০০০ সালে ডেঙ্গুর যে নতুন প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে কেবল ভয়াবহ মহামারিতেই রূপ নেয়নি, বরং দেশের ভৌগোলিক সীমা ছাড়িয়ে প্রতিটি জনপদে বিস্তৃত হয়েছে। গত দুই দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিবছরই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। তবে ২০২৩ সালটি ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিপর্যয়কর অধ্যায়। ওই বছর ডেঙ্গুতে যত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এবং যত প্রাণহানি ঘটেছে, তা আগের ২৩ বছরের মোট পরিসংখ্যানকেও ছাড়িয়ে গেছে।

একসময় ধারণা করা হতো ডেঙ্গু কেবল রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোর একটি সীমাবদ্ধ অসুখ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। এডিস মশাবাহিত এই রোগ এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৬৮ শতাংশই ছিল ঢাকার বাইরের বাসিন্দা।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ২০২৩ সালের তুলনায় পরবর্তী বছরগুলোতে সংক্রমণের সংখ্যা কিছুটা কম মনে হলেও এটি
এখন দেশের প্রতিটি জনপদের স্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে আটকে নেই; এটি সারা বছরের অসুখে পরিণত হয়ে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। ঢাকা বা বড় শহরগুলো কিছুটা হলেও ডেঙ্গু মোকাবিলায় সক্ষমতা অর্জন করেছে, কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় এ রোগের চিকিৎসা পরিকাঠামো এখনো অত্যন্ত নাজুক।

সর্বোচ্চ মৃত্যুহার বাংলাদেশে

বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণের চেয়েও বেশি ভীতিকর দিক হলো এর উচ্চ মৃত্যুহার। আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল এপিডেমিওলজি অ্যান্ড ইনফেকশন-এ প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ‘আনরাভেলিং দ্য ডেঙ্গু সার্জ ইন সাউথ এশিয়া ডিউরিং ২০০০–২০২৩: প্যাটার্ন, ট্রেন্ড, জেনোমিক্স, অ্যান্ড কি ডিটারমিন্যান্টস’ শীর্ষক এই গবেষণাটির নেতৃত্বে ছিলেন নাজমুল হায়দার। এই গবেষণায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য সংস্থা যুক্ত ছিল। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) এতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ২০২৩ সালের তুলনায় পরবর্তী বছরগুলোতে সংক্রমণের সংখ্যা কিছুটা কম মনে হলেও এটি
এখন দেশের প্রতিটি জনপদের স্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো নির্দিষ্ট মৌসুমে আটকে নেই; এটি সারা বছরের অসুখে পরিণত হয়ে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।

গবেষণাটির মূল লক্ষ্য ছিল ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ, মৃত্যুর ধরন, প্রবণতা এবং এর জিনগত বিবর্তন বিশ্লেষণ করা। গবেষকেরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডেটাবেজ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে কালপর্বভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ পূর্বাভাস প্রদান করেছেন। এই গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গুতে যত মৃত্যু হয়েছে, তার ২৫ শতাংশের বেশি (১,৭০৫ জন) ঘটেছিল শুধু বাংলাদেশে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে মূলত ডিইএনভি–২ এবং ডিইএনভি–৩ সেরোটাইপের আধিক্য লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে, ২০২২ সালে ভারতে মহামারি সৃষ্টিকারী ডিইএনভি–২ ভাইরাসটিই ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ভয়াবহ সংক্রমণের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

জিকা ও চিকুনগুনিয়া নিয়েও উদ্বেগ

এডিস মশাবাহিত জিকা ভাইরাস বাংলাদেশে প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৪ সালে। সরকারের আইইডিসিআর সংরক্ষিত রক্তের নমুনা পরীক্ষা করে এই ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। প্রথম আক্রান্ত রোগী চট্টগ্রামের বাসিন্দা। যদিও ২০১৭ সালে একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম সবার সামনে আসে, কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর গবেষকেরা আবারও জিকার ফিরে আসার ব্যাপারে সতর্ক করছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে আইসিডিডিআরবির হিসাবে ১০ থেকে ১২ জন জিকা রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা বাস্তবে আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 জিকা ভাইরাসের বাহকও এডিস মশা। আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ভাইরাসের বিবর্তন এবং মানুষের আন্তসীমান্ত যাতায়াত জিকার নতুন ঢেউ ডেকে আনতে পারে। এটি অন্ত জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এটি অনাগত শিশুর ‘মাইক্রোসেফালি’ (মস্তিষ্কের গঠন ছোট হওয়া) তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান মশা পরিস্থিতি জিকার মতো নতুন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটানোর জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় বরগুনা সদর হাসপাতালের মেঝেতেও থাকতে হয় ডেঙ্গু রোগীদের। গত বছরের জুন মাসে তোলা
ছবি: সাইয়ান

পাশাপাশি ২০১৭ সালে বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ার যে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল, তা এখনো জনমনে আতঙ্কের কারণ। এডিস ইজিপ্টি ও এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার মাধ্যমে ছড়ানো এই রোগ সরাসরি প্রাণঘাতী না হলেও এর যন্ত্রণাদায়ক হাড়ের ব্যথা রোগীকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর আড়ালে চিকুনগুনিয়া ঢাকা শহরের একটি বড় অংশে প্রভাব ফেলছে। গবেষকদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভবনের ছাদে বাগান, ড্রাম এবং পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি চিকুনগুনিয়ার বাহক মশার বংশবিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন যে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার লক্ষণ প্রায় একই হওয়ায় সাধারণ মানুষ অনেক সময় ভুল চিকিৎসা নেন।

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টিটু মিঞা বলেন, চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আগের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে, যদিও এ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তুলনামূলক কম।

২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ার ব্যাপক প্রকোপ শুরু হয়। জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ৩ হাজার ৬৮৩ জন চিকুনগুনিয়া রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এসপেরিয়ার হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুই মশাবাহিত রোগ এখন মানুষের শরীর ও জীবিকায় মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, ২০২৫ সালে ঢাকাতেও চিকুনগুনিয়ার বড় সংক্রমণ দেখা গেছে। সরকারের আইইডিসিআর জানিয়েছে, ২০২৪ সালের শেষের দিক থেকে জিকা ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টিটু মিঞা বলেন, চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আগের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে, যদিও এ নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তুলনামূলক কম।

বাড়ছে মানুষের খরচ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, জিকা কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগগুলো কেবল শরীরের ওপর আঘাত হানে না; বরং একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। প্রতিটি সংক্রমণের পেছনে যে পরিমাণ ভীতি ও শঙ্কা কাজ করে, তার সমান্তরালে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়। সরকারি হাসপাতালগুলোতে নামমাত্র খরচে কিছু সেবা পাওয়া গেলেও চিকিৎসার সিংহভাগ ব্যয়ভার বহন করতে হয় রোগীর পরিবারকেই। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি পরিসংখ্যানে মশাবাহিত রোগের যে সংখ্যা দেখানো হয়, বাস্তবে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি।

চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়াবহতার এক বাস্তব উদাহরণ রাজধানীর বাড্ডার বাসিন্দা চিকিৎসক সালেহীন (ছদ্মনাম)। ২০২৫ সালে তিনি নিজেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। নিজে চিকিৎসক এবং রাজধানীর একটি নামী হাসপাতালে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও তিনি চিকিৎসার নামে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার শিকার হন। সালেহীন বলেন, ‘আমার শারীরিক পরিস্থিতি খুব একটা জটিল ছিল না, কিন্তু নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণের জন্য আমাকে কেবিন নিতে হয়। মাত্র কয়েক দিনের চিকিৎসায় আমার খরচ হয়ে যায় প্রায় দেড় লাখ টাকা। আমি নিজে চিকিৎসক হয়েও দেখেছি, কীভাবে সাধারণ রোগীর পকেট কাটা হয়। আমি নিজেও সেই ব্যবস্থার শিকার হলাম।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদের নেতৃত্বে ২০২৩ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত প্রতিটি পরিবারের মাথাপিছু গড় ব্যয় ছিল ১৯ হাজার টাকার বেশি। এই খরচের মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা, ওষুধ, যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক ব্যয়। ওই বছর দেশের মানুষের পকেট থেকে কেবল ডেঙ্গুর পেছনেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, অনেক পরিবার তাদের মাসিক আয়ের চেয়েও বেশি ব্যয় করেছে চিকিৎসায়। এই বিপুল খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি অনেকে শেষ সম্বল বা সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। অধ্যাপক হামিদ বলেন, এই খরচ কেবল ওষুধের নয়; পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল এবং আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনার পেছনেও বড় অঙ্ক ব্যয় হয়। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি অপূরণীয়।

মশা প্রতিরোধ পণ্যের রমরমা ব্যবসা

মশাবাহিত রোগের এই আতঙ্ক ও প্রাদুর্ভাবকে পুঁজি করে দেশে মশা নিধন সামগ্রীর একটি বিশাল ও ক্রমবর্ধমান বাজার গড়ে উঠেছে। এটি কেবল বাংলাদেশের চিত্র নয়, বিশ্বব্যাপী মশা প্রতিরোধক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। দিল্লিভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিক্সডব্লিউরিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মশা প্রতিরোধক পণ্যের বাজারে গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হবে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে এই সামগ্রীর বাজার ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৪ সাল নাগাদ এই ব্যবসার আয়তন ১২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকবে। বাংলাদেশে এই বাজার বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের উচ্চ উপস্থিতি এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য সচেতনতা।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকায় মশা নিধনের চেষ্টা। গত অক্টোবর মাসে তোলা
ছবি: আবদুর রহমান

সব মিলিয়ে এই খাতের বাজার বর্তমানে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কয়েলের আধিপত্য থাকলেও মানুষ এখন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা মাথায় রেখে প্রাকৃতিক বা জৈব উপাদানভিত্তিক রিপেলেন্ট, ক্রিম এবং ইলেকট্রনিক ডিভাইসের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। বিশেষ করে রাসায়নিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় নিরাপদ পণ্যের চাহিদা ভবিষ্যতে এই বাজারকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

নতুন শঙ্কা ‘ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস’

মশার উপদ্রব এখন কেবল বিরক্তির কারণ নয়; বরং নিত্যনতুন প্রজাতির মশার আগমন জনস্বাস্থ্যকে নতুন শঙ্কার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দেশে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উপদ্রবকারী মশা হলো কিউলেক্স। এর কামড়ে কেবল মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে না; বরং এটি ফাইলেরিয়া এবং জাপানি এনসেফালাইটিসের মতো জটিল রোগের বাহক। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে এই রোগে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে।

আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘মশাবাহিত রোগগুলোর বিস্তার বেড়েছে এবং নতুন নতুন প্রাণঘাতী ভাইরাস আসার আশঙ্কাও তীব্র। বিশেষ করে বাংলাদেশের যেসব অঞ্চলে শূকর পালন করা হয়, সেখানে জাপানি এনসেফালাইটিসের ঝুঁকি অনেক বেশি।’ শফিউল আলমের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে মশার বংশবিস্তার যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে বাংলাদেশে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস প্রবেশের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে ভারত ও নেপালে এই ভাইরাস পাওয়া গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মশা মূলত সংক্রমিত পাখির শরীর থেকে এই ভাইরাস সংগ্রহ করে এবং মানুষের শরীরে ছড়িয়ে দেয়। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস সাধারণত কাকজাতীয় পাখির শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সঠিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুও হতে পারে।