জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যুক্ত হলো পাঠ্যবইয়ের ইতিহাস অংশে

১ জানুয়ারি বিনা মূল্যের পাঠ্যবই তুলে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের হাতে। এবারের বইয়ে ইতিহাস অংশে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু যুক্ত করা হয়েছেফাইল ছবি: প্রথম আলো

ইতিহাসের অংশ হিসেবে নতুন পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু। একই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থান নিয়েও লেখা। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে মূলত এসব বিষয় নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে।

এর পাশাপাশি আগে থাকা ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন লেখায় কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে অধিকাংশ জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় উপাধি রাখা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য-কণিকা বই থেকে ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ গদ্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে। এই গদ্যে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল। সদ্য শেষ হওয়া বছরে অষ্টম শ্রেণির ওই পাঠ্যবইয়ে গদ্যটি ছিল। এবার এটি বাদ দেওয়ায় এ বইয়ে একটি গদ্য কমে মোট গদ্য হয়েছে ১১টি।

১ জানুয়ারি শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যের নতুন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও মাধ্যমিক স্তরে এখনো বিপুলসংখ্যক বই সরবরাহ করতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ফলে বছরের শুরুতেই মাধ্যমিকের সব শিক্ষার্থী সব বিষয়ের বই হাতে পায়নি।

নতুন শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য মাধ্যমিক স্তরে (ইবতেদায়ি স্তরসহ) ২১ কোটি ৪৩ লাখের বেশি কপি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মাধ্যমিকে ৭৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৮৫ শতাংশের বেশি, সপ্তম শ্রেণিতে ৬৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং অষ্টম শ্রেণির প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং নবম শ্রেণিতে প্রায় ৮৮ শতাংশ ও ইবতেদায়ি স্তরে ৯৬ শতাংশের বেশি বই সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ছাপা হয়েছে আরও বেশি। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে মোট ৮ কোটি ৫৯ লাখের বেশি বইয়ের মধ্যে সব বই সরবরাহ করা হয়েছে।

যেসব বইয়ে যুক্ত হলো গণ-অভ্যুত্থান

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন শিক্ষাক্রম বাদ দিয়ে ২০১২ সালে প্রণীত পুরোনো শিক্ষাক্রমের আলোকে পাঠ্যবই পরিমার্জন করে। তারই ধারাবাহিকতায় বিদায়ী বছর পঞ্চম শ্রেণি থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য, গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল সাহিত্যের অংশ।

এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম এবং নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পাঠ্যবইয়ের অধ্যায়ে যুক্ত করা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন পাঠ্যবইয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়ে আছে ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’। এই অধ্যায়ের শেষাংশে ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ নামের একটি আলাদা পাঠ রাখা হয়েছে। এতে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের ছোট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। একই পাঠে গণ-আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের বিবরণ ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলা হয়, ‘এই গণ-আন্দোলনকে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান” নামে অভিহিত করা হয়। এই গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, ঐক্য এবং সাহসের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেন আবু সাঈদ
ফাইল ছবি

এই পাঠে দুটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। একটি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের এবং অন্যটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের।

শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় বিষয়বস্তুর পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে এনসিটিবি কর্মকর্তারা জানান। ষষ্ঠ শ্রেণিতে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা থাকলেও পর্যায়ক্রমে সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে তা বাড়ানো হয়েছে। সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণ-আন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ নামে নতুন পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। এখানেও ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের বর্ণনা রয়েছে। এই অধ্যায়েও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি দেওয়া হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণ-অভ্যুত্থান’ শিরোনামে আলাদা পাঠ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানেও নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এখানেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের ছবি রয়েছে। আর ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধের গণসমাবেশের একটি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ শীর্ষক অধ্যায়ে ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ বিষয়ে একটি অংশ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করা হয়ে; যা তুলনামূলকভাবে আগের তিনটি বইয়ের চেয়ে বেশি বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত দলের প্রতিবেদনের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে এই বইয়ে। এ বিষয়ে বলা হয়, ‘জাতিসংঘ গঠিত একটি তদন্ত দলের রিপোর্টমতে, এই আন্দোলনের উত্তাল ৩৬ দিনে প্রায় দেড় হাজার মানুষ শাহাদাতবরণ করেন। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ শিশু।’

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন বাংলাদেশের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ এক ঘটনা
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

এভাবে আরও ঘটনা ও প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে বলা হয়, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান নিছক কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং এটি বাংলাদেশিদের জাতীয় জীবনে নতুন নাগরিক চেতনার উন্মেষ। এই চেতনার সারমর্ম হলো গণতন্ত্র, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা। এর মধ্য দিয়ে জনগণের এমন এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, যার মাধ্যমে মানুষ জানিয়ে দিয়েছে যে তারা আর কখনোই স্বৈরাচার, দুঃশাসন, জুলুম এবং নিপীড়নের কাছে পরাভব মানবে না।’


‘তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যেন থাকে’

এনসিটিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সিদ্ধান্ত ও সরকারের সিদ্ধান্তের আলোকেই এবারের পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। এ কাজে এনসিটিবিও যুক্ত ছিল। তবে কোনো কোনো বিষয় পরিবর্তন করা নিয়ে মতপার্থক্য ছিল।

এনসিসিসি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের একটি কমিটি। এখানে বাইরের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরাও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। এবারের পরিবর্তনে এনসিসিসির কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

গত বছর জানুয়ারিতে পাঠ্যবই বিতরণের সময়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এ কে এম রিয়াজুল হাসান। এখন তিনি অবসরে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বিদায়ী বছরের বাংলা-ইংরেজি বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে গল্প ও কবিতা যুক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন বইয়ে গ্রাফিতিও যুক্ত করা হয়েছিল। তখনই ইতিহাসের অংশ হিসেবে তা যুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সময় কম থাকায় সম্ভব হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ইতিহাসের অংশ হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু যাচ্ছে।

‘এটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যেন সঠিক থাকে। কেউ যেন আপত্তি তুলতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে,’ বলেন এ কে এম রিয়াজুল হাসান।