কিডনির ত্রুটির কথা গ্রহীতাদের জানাননি চিকিৎসকেরা, মারা গেছেন একজন

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ত্রুটিযুক্ত অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা চিকিৎসা ও নৈতিকতার দিক থেকে ঠিক হয়নি।

কিডনি
প্রতীকী ছবি

সারাহ ইসলামের কিডনিগ্রহীতা দুই নারীর একজন মারা গেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুই নারীর দেহে প্রতিস্থাপন করা দুটি কিডনিতেই ত্রুটি ছিল। কিডনিগ্রহীতা দুই নারী বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এ ত্রুটির কথা জানতেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসা ও নৈতিকতার দিক থেকে ত্রুটিযুক্ত কিডনি প্রতিস্থাপন ঠিক হয়নি।

দেশে প্রথম ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষিত সারাহ ইসলামের কিডনি ১৮ জানুয়ারি দুই নারীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) শামীমা আক্তার নামের এক রোগীর শরীরে একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। বাকি কিডনিটি হাসিনা আক্তার নামের অন্য এক রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয় বেসরকারি কিডনি ফাউন্ডেশনে।

কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও বিশিষ্ট কিডনি রোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারুন আর রশিদ গত বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, হাসিনা আক্তার চার সপ্তাহ আগে কিডনি ফাউন্ডেশনে মারা গেছেন। তাঁর সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল।

হারুন আর রশিদ আরও বলেন, হাসিনা আক্তারের শরীরে যে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তা ছিল দুর্বল। তাতে দুটি টিউমার ছিল। প্রতিস্থাপনের আগে টিউমার দুটি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। প্রতিস্থাপনের পর থেকে হাসিনা বারবার সংক্রমণে ভুগছিলেন।

অন্যদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার শামীমা আক্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শামীমার জন্য মাসে ১৫-২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। তাঁর শরীর মাঝেমধ্যে খারাপ হয়। তবে ডায়ালাইসিস করা লাগছে না। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ২৫ লাখ টাকার অর্থ সাহায্য দেওয়া হয়েছে।

কিডনিতে কোনো সমস্যা থাকলে তা অবশ্যই গ্রহীতাকে জানানো উচিত। এটা জানা গ্রহীতার অধিকার। নৈতিকতার দিক থেকেও কাজটি ঠিক হয়নি।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ

কিডনিতে ত্রুটি ছিল

২০ বছর বয়সে সারাহ ইসলাম মারা যান। সারাহ ইসলাম টিউবেরাস স্ক্লেরোসিস রোগে ভুগছিলেন। বয়স এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই জিনগত এই রোগ শনাক্ত হয়। এই রোগ সম্পূর্ণ নিরাময়ের চিকিৎসা নেই। ২০২২ সালের অক্টোবরে সারাহকে বিএসএমএমইউতে ভর্তি করা হয়। ১০ জানুয়ারি তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার হয়। ১৩ জানুয়ারি তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেই দিন গভীর রাতে তাঁকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। ১৮ জানুয়ারি সারাহর ‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষণা করা হয়।

চিকিৎসকেরা বলেছেন, দীর্ঘদিন টিউবেরাস স্ক্লেরোসিসে ভোগার কারণে সারাহর শরীরে কিছু জটিলতা ছিল। ১৯ জানুয়ারি বিএসএমএমইউর আইসিইউ থেকে সারাহ ইসলামের রোগ শনাক্তের যে সংক্ষিপ্তসার দেওয়া হয়েছিল, তাতে বলা হয়, টিউবেরাস স্ক্লেরোসিসের সঙ্গে সারাহর দুটি কিডনিতে টিউমার (বাইলেটারাল রেনাল এনজিওমাইওলাইপোমা) আছে।

এর আগে দেশে মৃত ঘোষিত কোনো ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়নি। ওই সময় সারাহ ইসলামের দুটি কর্নিয়া দুজনের চোখে লাগানো হয়েছিল।

আরও পড়ুন

তাঁরা জানতেন না

শামীমা আক্তারের ভাই শাহজাদা আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিডনিতে ত্রুটি আছে, এটা জানলে আমরা কিডনি নিতাম না। আমাদের কেউ জানায়নি। না জানালে আমরা কী করে জানব।’ তবে এ ব্যাপারে হাসিনা আক্তার বা তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

‘ব্রেন ডেথ’ ঘোষিত ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনবিষয়ক জাতীয় কমিটির সভাপতি বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক মো. শারফুদ্দিন আহমেদ। দেশের বাইরে থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সারাহ ইসলামের কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসক দলের প্রধান শল্যচিকিৎসক ছিলেন হাবিবুর রহমান। কিডনিতে ত্রুটি থাকার বিষয়টি গ্রহীতাদের জানানো উচিত ছিল কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাদের জানার দরকার নেই।’

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপনের মূল উদ্দেশ্য গ্রহীতাকে সুস্থ করে তোলা। ত্রুটিপূর্ণ কিডনি দিয়ে তা সম্ভব নয়। চিকিৎসার দিক থেকে কাজটি ঠিক হয়নি। কিডনিতে কোনো সমস্যা থাকলে তা অবশ্যই গ্রহীতাকে জানানো উচিত। এটা জানা গ্রহীতার অধিকার। নৈতিকতার দিক থেকেও কাজটি ঠিক হয়নি।

সারাহ ইসলামের কিডনি প্রতিস্থাপন চিকিৎসক দলের প্রধান শল্যচিকিৎসক ছিলেন হাবিবুর রহমান। কিডনিতে ত্রুটি থাকার বিষয়টি গ্রহীতাদের জানানো উচিত ছিল কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘তাদের জানার দরকার নেই।’