বাংলাদেশি উদ্যোক্তা রাফি হোসেনের ফ্যাসেট পেল ৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ

মোহাম্মদ রাফি হোসেন, প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা, ফ্যাসেটছবি: বিজ্ঞপ্তি

ব্লকচেইন অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকিং ও পেমেন্ট–সেবা গড়ে তোলা ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান ধারায় এগিয়ে চলছে শরিয়াহসম্মত ডিজিটাল ব্যাংক ‘ফ্যাসেট’। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা মোহাম্মদ রাফি হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত ডিজিটাল ব্যাংক ফ্যাসেট তাদের স্টেবলকয়েনচালিত ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণে ৫১ মিলিয়ন ডলার তুলেছে।

প্রচলিত পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ছেড়ে ব্লকচেইন অবকাঠামোর ওপর আর্থিক সেবা গড়ে তুলছে যেসব ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, ফ্যাসেট বর্তমানে তাদের মধ্যে অন্যতম আলোচিত নাম। এর আগে বাংলাদেশি কোনো উদ্যোক্তা গ্লোবাল নিওব্যাংকিং ও ক্রস বর্ডার পেমেন্ট খাতে এত বড় বিনিয়োগ পাননি।

সরকারি কিংবা বেসরকারি খাত—দুই জায়গাতেই রাফি একটা জিনিস লক্ষ করেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মেধার কোনো অভাব নেই। কিন্তু সেই মেধাকে কাজে লাগানোর জন্য যে আর্থিক ব্যবস্থা দরকার, সেটা এখনো মজবুত নয়। সেই ব্যবস্থায় লেনদেনের খরচ বেশি, গতি কম আর বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ খুবই দুর্বল।

বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্টের সুবিধা এখনো অনেকটাই সীমিত। পেপ্যালের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম এই বাজারে এখনো প্রবেশ করেনি। ফলে বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে টাকা তুলতে ফ্রিল্যান্সার, রিমোট ওয়ার্কার আর ছোট ব্যবসাগুলোকে বাড়তি খরচ আর জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফ্যাসেটের ব্লকচেইন–ভিত্তিক অবকাঠামো এই বাধাটা কমিয়ে আনতে সক্ষম। ফলে বাংলাদেশিদের জন্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট পাওয়া সহজ হবে এবং এই দেশের ফ্রিল্যান্সার আর উদ্যোক্তারা গ্লোবাল ইকোনমিতে আরও সরাসরি অংশ নিতে পারবেন।

লস অ্যাঞ্জেলেস–ভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান ১৫ মে জানিয়েছে, সিরিজ বি রাউন্ডে বিনিয়োগ করেছে জাপানের এসবিআই গ্রুপ, ইনভেস্টকর্প ও তুরস্কের সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান আরজ পোর্টফয়।

ফ্যাসেট এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ৫০টির বেশি করিডোরে ব্যাংকিং ও পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার চেয়ে দ্রুততর ও কম খরচে সীমান্তের ওপারে অর্থ পাঠাতে স্টেবলকয়েন ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি।

ফ্যাসেট সদ্যপ্রাপ্ত ফান্ডিং দিয়ে স্টেবলকয়েন পেমেন্ট ও কাস্টডির জন্য নিজস্ব অবকাঠামো ‘ওউন নেটওয়ার্ক’–এর সম্প্রসারণ ও নতুন বাজারে প্রবেশ, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য ঋণ ও বাণিজ্য অর্থায়ন পণ্য তৈরির পরিকল্পনা করছে।

ফ্যাসেট তাদের পুরো ব্যাংকিং ও পেমেন্ট সেবা দাঁড় করিয়েছে ব্লকচেইন ও স্টেবলকয়েনের ওপর। এই পদ্ধতি এখন বৈশ্বিক অর্থায়নে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রেমিট্যান্স, ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পর্যন্ত সব জায়গায় স্টেবলকয়েন এখন বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে। কারণ, উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রচলিত করেসপন্ডেন্ট ব্যাংকিং–ব্যবস্থায় ক্রস-বর্ডার লেনদেন ধীর এবং ব্যয়বহুল। ব্লকচেইন–ভিত্তিক পেমেন্ট সেই নির্ভরতা কমিয়ে আনে। এই সুযোগটাই কাজে লাগাচ্ছে বিশ্বের বড় ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলো।

গত মাসেই ব্যবসায়িক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান স্ল্যাশ ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে, মূল্যায়ন দাঁড়িয়েছে ১.৪ বিলিয়ন ডলারে। প্রতিষ্ঠানটি স্ট্রাইপের ব্রিজের সঙ্গে মিলে একটি স্টেবলকয়েনও চালু করেছে, যাতে আন্তর্জাতিক ব্যবসায় টাকা পাঠানো ও গ্রহণ করা আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হয়।

গত বছর ফ্যাসেটের বার্ষিক লেনদেনের পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাপী এক হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। সম্প্রতি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টেবলকয়েন ইউএস ডলার টেথার (US Dollar Tether) (ইউএসডিটি) নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান ‘টেথার লিমিটেডে’র (Tether Limited) সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বের প্রথম গোল্ড-ব্যাকড নিওব্যাংকিং কার্ড বাজারে এনেছে।

ফ্যাসেটের প্রধান নির্বাহী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রাফি হোসেন বলেন, ‘আমরা এমন একটি পৃথিবীর জন্য ফ্যাসেট গড়ছি, যেখানে তথ্য যেভাবে সীমানা পেরোয়, অর্থও সেভাবে পেরোবে। এই ফান্ডিং রাউন্ড নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং সেবা গড়ে তোলার এবং যেসব বাজারে আমাদের সেবা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে পৌঁছানোর আমাদের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।’

রাফি হোসেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলে এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নে পড়াশোনা করেছেন। পড়াশোনা শেষে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে। সাবেক আরব আমিরাত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন।