রয়টার্সের বিশ্লেষণ
জেন-জি অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচন: বাংলাদেশে তরুণ শক্তির দৌড় কি রাজপথেই সীমাবদ্ধ
বাংলাদেশে জেন–জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের হাত ধরে অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচনে ৩০০ আসনের সংসদে তরুণদের গঠিত দল পেয়েছে মাত্র ছয়টি আসন। এর মাধ্যমে রাজপথের সেই উত্তাল গণজোয়ারকে ভোটব্যাংকে রূপান্তর করার কঠিন চ্যালেঞ্জটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভোটারেরা দেশের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে বিপুলভাবে জয়ী করেছেন। দলটি এর আগেও তিনবার দেশ শাসন করেছে। সবশেষ ২০০১–০৬ মেয়াদে দলটি ক্ষমতায় ছিল।
অন্যদিকে ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাত ধরে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একটি জোটের অংশ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি।
জোট গঠন নিয়ে সমর্থকদের অসন্তোষ
এনসিপির অনেক সমর্থক বলেছেন, দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গত ডিসেম্বরে নির্বাচনী জোটে যাওয়াই এনসিপির জন কাল হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা কার্যত মূল লড়াই থেকে ছিটকে গেছে।
শুরুতে প্রায় সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও এনসিপি শেষ পর্যন্ত মাত্র ৩০টি আসনে লড়েছে। দলটির নেতাদের দাবি, ঢাকায় আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য খুন হওয়ার পর নিরাপত্তার খাতিরে বড় একটি দলের ছত্রচ্ছায়ায় যাওয়া প্রয়োজন ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, নির্বাচনের আগে পর্যাপ্ত জনসমর্থন তৈরিতেও ব্যর্থ হয়েছে এনসিপি।
২৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সোহানুর রহমান বলেন, ‘২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর মানুষের যে স্বপ্ন ছিল, তারা তা পূরণ করতে পারেনি। জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোট করাটা বিশ্বাসঘাতকতা বলেই মনে হয়েছে। এ কারণে আমাদের মতো তরুণ ভোটাররা তাদের সমর্থন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
এনসিপির বিজয়ী ৬ প্রার্থীর একজন আবদুল্লাহ আল আমিন (৩২)। তিনি পেশায় আইনজীবী এবং দলটির যুগ্ম সদস্যসচিব। তিনি বলেন, আরও অনেক আসনে তাঁর দলের জয়ের প্রত্যাশা ছিল। কিছু আসনে তারা সামান্য ব্যবধানে হেরেছেন।
আল আমিন বলেন, ‘আমাদের যাত্রা সবে শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে বাংলাদেশকে পরিবর্তনের যে স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, সেই লক্ষ্যেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে চাই।’
নজর স্থানীয় নির্বাচনে
আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করায় তাঁদের জন্য ছয় আসনে জেতা সহজ হয়েছে।
তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক শাকিল আহমেদ মনে করেন, এই জোট সেসব তরুণ ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে, যারা হাসিনার পতনের পর একটি নতুন ধারার রাজনীতি চেয়েছিলেন।
শাকিল আহমেদ বলেন, অনেক মনে করছেন, দলটি পুরোনো রাজনৈতিক ধারাকে ভেঙে দেওয়ার বদলে সেই ধারাতেই ফিরে গেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার এই সিদ্ধান্তে তরুণদের ভোট বিভক্ত হয়েছে এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিজেকে আরও সুসংগঠিত ও শাসনক্ষমতার যোগ্য হিসেবে প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেন, তারা বিরোধী দলে থেকে নিজেদের পুনর্গঠন করবেন এবং এক বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মনোযোগ দেবেন।
এর আগে গত ডিসেম্বরে দলটির প্রধান নাহিদ ইসলাম রয়টার্সকে বলেছিলেন, দল গোছানোর জন্য তাঁদের হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় তহবিল স্বল্পতা এবং নারী ও সংখ্যালঘু অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অস্পষ্ট অবস্থানের কারণে তারা পিছিয়ে পড়েছেন।
অধ্যাপক শাকিল আহমেদ বলেন, এনসিপি যদি নতুন করে নিজেদের স্বকীয়তা তৈরি করতে না পারে এবং এই জোট থেকে দূরত্ব বজায় না রাখে, তবে তারা জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। সেক্ষেত্রে তারা একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির বদলে কেবল একটি নামসর্বস্ব দলে পরিণত হয়েই থেকে যেতে পারে।’
পরাজিত তরুণ প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম তাসনিম জারা। ৩১ বছর বয়সী এই চিকিৎসক জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠনের প্রতিবাদে ডিসেম্বরে এনসিপি ছেড়ে ঢাকা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়েছিলেন। তিনি ৪৪ হাজারের বেশি ভোট পেলেও বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।
তাসনিম জারা বলেন, ‘আমরা দেখিয়েছি, পরিচ্ছন্ন ও সৎ প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করা যায়। সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট হয়েছে। তবে স্বচ্ছ রাজনীতির ধারাকে টিকিয়ে রাখতে হলে আরও দৃঢ় হতে হবে। ভয়ভীতি মোকাবেলায় সক্ষম আমাদের এমন একটি শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
নির্বাচনে নিজের পাওয়া ভোটের সংখ্যা তুলে ধরে তাসিনম জারা আরও বলেন, ব্রিটেনে চিকিৎসা পেশায় ফিরে না গিয়ে তিনি দেশেই রাজনীতি চালিয়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের সেরা সময় এখনো সামনে।’