জমি চেয়ে রাজউককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে চিঠি দিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল, ৬০০ একর জমি নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশ্ববিদ্যালয়টির এখন ২৫০ একর জমি আছে। দেশের প্রয়োজনে ও নানা অজুহাতে বাকি জমি নিয়ে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম উন্নত করার জন্য পূর্বাচলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখন বলছে, তারা পূর্বাচলের জমিতে গবেষণা ও উদ্ভাবন ক্যাম্পাস করতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য  মো. আখতারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, পূর্বাচলের জমিতে কী করা হবে, সে বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি যাতে চূড়ান্ত করা হয়, সে ব্যাপারে ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ও নির্দেশনা’ চাওয়া হয়েছে।

প্রভাবশালীদের ‘নজর’

রাজউকের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিটি বরাদ্দ নেওয়ার জন্য প্রভাবশালী একটি মহল চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছে। মহলটি সেখানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করতে চায়। পূর্বাচলে আরেকটি ক্যাম্পাস হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দ্বিখণ্ডিত হবে, একাডেমিক কার্যক্রমে সমস্যা হবে—এমন যুক্তিও দেখানো হচ্ছে।

পূর্বাচলের জমিতে কী করা হবে, সে বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি যাতে চূড়ান্ত করা হয় সে ব্যাপারে ‘প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন ও নির্দেশনা’ চাওয়া হয়েছে।
মো. আখতারুজ্জামান, উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে বরাদ্দ করা জমি থেকে ১০ একর জমি চায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও। এ নিয়ে গত ২৫ অক্টোবর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। বৈঠক শেষে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পূর্বাচলের জমি গ্রহণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপারগতা প্রকাশ করেছে। এমন অবস্থায় সেখান থেকে ১০ একর জমি যাতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সে উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানোর জন্য কমিটির পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়। অবশ্য পরদিনই সংসদীয় কমিটির দাবিকে অসত্য উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি পাঠায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্বাচলে জমির জন্য অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী বলেন, ‘এটা আমার নলেজে আসতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে সিদ্ধান্ত নেবে, মন্ত্রণালয় সেটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে উল্লেখ করেন শিক্ষা উপমন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, আরেক জায়গায় জমি নিয়ে সেখানে নতুন অবকাঠামো করার চেয়ে যেখানে কার্যক্রম চলছে সেটি চলমান রাখা এবং আরও উন্নত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ আছে, যেগুলো বর্তমান যুগ এবং কর্মসংস্থানের জন্য উপযোগী না। সেগুলো কমানোর জন্য আলোচনা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লটের প্রয়োজন এ মুহূর্তে না থাকলে, সে সিদ্ধান্ত তারা নেবেন এবং দৃশ্যত মনে হচ্ছে, সেটি সঠিক সিদ্ধান্ত।

টাকা দিতে হবে কত দিনে

রাজধানীর পূর্বাচলে ৬ হাজার ২২৭ একর জমিতে রাজউক পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে ১৯৯৫ সালে। সেটি এখনো শেষ হয়নি। সেখানে আবাসিক প্লট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, জলাধারসহ বিভিন্ন সুবিধার জন্য জমি রাখা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে জমি পেয়েছে, তা পূর্বাচল প্রকল্পের নকশায় প্রাতিষ্ঠানিক প্লট হিসেবে চিহ্নিত। রাজউকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে বরাদ্দপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে অর্থ পরিশোধের কোনো নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ নেই।

রাজউক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সংস্থাটির চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা পূর্বাচলের জমিটি বুঝে নেওয়ার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে ফোন করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওই এলাকায় গেলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও যাবে। মানুষ ঘরবাড়ি করবে। এই উদ্দেশ্যেই তিনি ফোন করেছিলেন। বরাদ্দ পাওয়ার চার বছরে টাকা পরিশোধ না করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জমি পেতে কোনো সমস্যা হবে না বলে জানান রাজউক চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দেওয়া বরাদ্দপত্র বাতিলের সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রী অনুশাসন দিলে নামমাত্র মূল্যে বা বিনা মূল্যেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জমিটি পেতে পারে।

‘জমিটি প্রয়োজন’

পূর্বাচলে জমি বরাদ্দ পেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ও বর্তমান সহ–উপাচার্য
(শিক্ষা) এএসএম মাকসুদ কামাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে আছে। নিবিড়ভাবে গবেষণা করার সুযোগ তৈরি করতে পূর্বাচলের জমিটি প্রয়োজন। বিশ্বের স্বনামধন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন-চারটি ক্যাম্পাস রয়েছে।