ঈদের মোনাজাতে যুদ্ধ বন্ধের আকুতি

পবিত্র ঈদুল ফিতরে আজ শনিবার সকালে রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহে প্রধান ঈদ জামাতে অংশ নিতে আসা এই ব্যক্তি তুলে ধরেছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান–সংবলিত এই প্ল্যাকার্ডছবি: দীপু মালাকার

মধ্যপ্রাচ্যের এক যুদ্ধে টালমাটাল এখন বিশ্ব; সেই যুদ্ধের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। তাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ শেষে মোনাজাতেও ধ্বনিত হলো যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান।

এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলমানদের আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে ঈদুল ফিতর। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কোটি কোটি মানুষের ঈদ উৎসব এবার ছিল ম্লান। গত শুক্রবার দেশগুলোতে ঈদুল ফিতর উদ্‌যাপিত হয়।

শাওয়ালের চাঁদ দেখার ভিত্তিতে বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর এক দিন পর আজ শনিবার। এদিন সকালে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর সুপ্রিম কোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহে। সকাল সাড়ে আটটার এই জামাতে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আরও পড়ুন

ঈদের শিক্ষা নিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়েন সবাই। এতে ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি আবদুল মালেক। নামাজ শেষে খুতবার পর মোনাজাতে হাত তোলেন সবাই।

ইমাম আবদুল মালেক দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি কামনা করেন। পাশাপাশি সারা বিশ্বে ফিতনা-ফ্যাসাদ বন্ধের প্রার্থনা তিনি যখন জানান, তখন ‘আমিন-আমিন’ ধ্বনিতে তাতে সমর্থন জানান হাজারো মুসল্লি।

পবিত্র ঈদুল ফিতরে আজ শনিবার সকালে রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহে প্রধান ঈদ জামাতে ইমামতি করেন মুফতি আবদুল মালেক
ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

মুফতি আবদুল মালেক মোনাজাতে বলেন, ‘হে আল্লাহ, বিশ্বের ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে মানুষকে হেফাজত করেন। যুদ্ধবিগ্রহ থেকে মানুষকে নিরাপত্তা দেন।’

মোনাজাতে ইমাম মুফতি আবদুল মালেক অসহায় মুসলমানদের পাশে দাঁড়াতে সব মুসলিম দেশের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘মজলুমদের জুলুম থেকে হেফাজত করেন। জালিমদের আপনি শায়েস্তা করে দেন আল্লাহ। কত জায়গায় মুসলমানরা মজলুম হয়ে আছে, অসহায়; আপনি তাদের সবচেয়ে উত্তম অভিভাবক। মানুষের মধ্যে আপনি তাদের জন্য অভিভাবক তৈরি করে দেন, প্রতিনিধি তৈরি করে দেন।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে মুসলিম দেশ ইরানে আক্রমণ শুরু করলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সূচনা হয়। পাল্টাপাল্টি হামলায় এখন আক্রান্ত হচ্ছে ওই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশ। এই দেশগুলোর সবই মুসলিমপ্রধান।

তেল-গ্যাসসমৃদ্ধ এই অঞ্চলের যুদ্ধ বিশ্বের জ্বালানি তেলের বাজার করে তোলে অস্থির। সংকট এড়াতে বাংলাদেশ সরকারও জ্বালানি তেল বিক্রিতে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ঈদের আগে গাড়ি চলাচল বিঘ্নিত হয়। ঈদযাত্রার সময় রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও এই যুদ্ধ চলতে থাকলে তেল-গ্যাসের সংকেট লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

জাতীয় ঈদগাহে আজ শনিবার সকালে ঈদের প্রধান জামাতে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

যুদ্ধের মধ্যে ইরানে আটকে পড়া দেড় শতাধিক বাংলাদেশিকে বিশেষ বিমান পাঠিয়ে ঈদের আগের দিনই বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

আবার যুদ্ধপীড়িত দেশগুলোতে এখন অর্ধকোটির বেশি বাংলাদেশি নানা কাজে রয়েছেন। যুদ্ধের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় এরই মধ্যে অন্তত পাঁচজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। যাঁরা এখনো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে রয়েছেন, তাঁরাও আছেন উৎকণ্ঠায়।

আরও পড়ুন

এই প্রবাসীদের জন্য দেশে থাকা তাঁদের স্বজনদের যেমন উদ্বেগ রয়েছে, তেমনি তা দেশের প্রবাসী আয় কমানোর ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি হলো রেমিট্যান্স, যার বেশির ভাগ আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকেই। ফলে এই যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে বাংলাদেশকে যে ভুগতে হবে, তা সহজেই অনুমেয়। দৃশ্যত সে কারণে ঈদের নামাজেও ছিল তার প্রতিফলন। জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে আসা এক ব্যক্তি একটি প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন, যেখানে ছিল যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান।

পবিত্র ঈদুল ফিতরে আজ শনিবার সকালে রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহে প্রধান ঈদ জামাতে অংশ নেন হাজারো মুসল্লি
ছবি: দীপু মালাকার

এবার ঈদে রাষ্ট্রপতির বাণীতেও ছিল এই সংকটের কথা। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকটের অনাকাঙ্ক্ষিত অভিঘাত বাংলাদেশের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ঈদের বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় ঐক্য, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার বন্ধন আরও সুদৃঢ় হওয়ার আশা প্রকাশ করেন।

প্রায় সাড়ে তিন দশক পর ঈদ জামাতে এবার একসঙ্গে দেখা গেল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে। আকাশি রঙের পাঞ্জাবি পরা তারেক রহমান সকাল ৮টা ২০ মিনিটে জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে আসেন। এর পাঁচ মিনিট পরই আসেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁর পরনে ছিল মেরুন রঙের পাঞ্জাবি। পাশাপাশি বসে ঈদের নামাজ আদায় করেন তাঁরা। নামাজ শেষে কোলাকুলিও করেন। তারেক রহমান নামাজ শেষে সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গেও শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জাতীয় ঈদগাহের জামাতে অংশ নেন।

ঈদের দিন ঝড়বৃষ্টির আভাস দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। সকালে রাজধানীর আকাশ মেঘলা থাকলেও জাতীয় ঈদগাহে প্রধান জামাত নির্বিঘ্নেই হয়েছে।

ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টরের তল্লাশির মধ্য দিয়ে সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে জাতীয় ঈদগাহে প্রবেশ করেন। নামাজের নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জাতীয় ঈদগাহ পরিপূর্ণ হয়ে যায়। জায়গা না পেয়ে রাস্তায় নামাজ আদায় করেন অনেকে।

পবিত্র ঈদুল ফিতরে আজ শনিবার সকালে রাজধানীতে জাতীয় ঈদগাহের ভেতরে জায়গা না পেয়ে অনেকে সড়কেই নামাজ আদায় করেন
ছবি: দীপু মালাকার

এবার জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে সব মিলিয়ে মূল প্যান্ডেলের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়। নারীদের জন্যও আলাদা নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা ছিল।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, আশপাশের সড়ক ও খোলা জায়গা মিলিয়ে এবার ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ মুসল্লির একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায়ের সুযোগ রাখা হয়।

আরও পড়ুন