রবিউলের ব্যাপারে গভীর সাগরে মাছ ধরার জাহাজের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘একসময় গভীর সাগরে মাছ ধরার জাহাজের পুরোপুরি প্রস্তুত জাল আমদানি হতো। পরে বিদেশিরাই এসে দেশে জাল সংযোজন করেন। এখন রবিউলের হাতেও জাল তৈরি হচ্ছে। এতে সাশ্রয় হচ্ছে বিদেশি মুদ্রা। জালের গুণগত মানও ঠিক পাচ্ছি। খরচও পড়ছে কম।’

জাহাজের জাল তৈরির বিষয়টি আরও একটু খোলাসা করেন নুরুল কাইয়ুম খান। তিনি জানান, গভীর সাগরে মাছ ধরার জাল নকশা অনুযায়ী করতে হয়। এতে ব্যত্যয় হলে মাছ পড়বে না। জালের ফেব্রিকস থেকে শুরু করে সব সরঞ্জাম আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। এরপর দেশে সংযোজন করা হয়। এভাবে সব সরঞ্জাম দিয়ে নকশা মেনে তৈরি হয় একটি পরিপূর্ণ জাল।

দেশে এখন রবিউলের পাশাপাশি ডেনমার্কের কসমস ট্রল ও বাংলাদেশের সি-রিসোর্সেস গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এসআরএস কসমস ট্রল লিমিটেড নামের একটি কারখানা জাল ও সরঞ্জাম তৈরি করে আসছে। 

জালের সঙ্গে ‘সখ্য’

এসএসসি পাস করে ২০০৬ সালের শুরুতে গ্রামের বাড়ি নরসিংদী থেকে চট্টগ্রাম নগরে ভাইয়ের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন রবিউল ইসলাম। তাঁর ভাই তখন মাছ ধরার জাহাজে চাকরি করেন। ভাইয়ের সঙ্গে জাহাজে বেড়াতে যান। জাহাজে ওঠে ভালো লেগে যায় রবিউলের। ভাইয়ের সুবাদে ‘এফভি জারান’ জাহাজে চাকরি হয় ২০০৬ সালের শেষে দিকে। জাল দেখাশোনা করাই ছিল প্রথম কাজ। 

রবিউলের আগ্রহ দেখে জাল নিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দেন এফভি জারান জাহাজের মালিকানা প্রতিষ্ঠান এম এম আগা অ্যান্ড কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক এ জে এম সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, রবিউলের কারণে এখন জালের জন্য বিদেশনির্ভরতা কমেছে। 

জাল নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিজে নিজে কাগজে নকশা বানান রবিউল। জাল কীভাবে পানিতে খুলে যায়, তা দেখতেন। কাজ করতে করতে দ্রুতই রপ্ত করেন খুঁটিনাটি। এরপর ‘নেট টেকনিশিয়ান’ হিসেবে নিয়োগ পান একটি কোম্পানিতে। শুরুতে কোম্পানির জাল মেরামত করতেন। এরপর ওই কোম্পানিতেই জাল সংযোজন শুরু করেন। সময়টা ২০১০ সালের শুরুর দিকে। 

উদ্যোক্তা রবিউলের যাত্রা

২০১২ সালের দিকে নিজের জমানো টাকায় চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে ইছানগরে মৎস্য বন্দরে ছাউনি ও গুদাম ভাড়া নিয়ে শুরু করলেন কাজ। কারখানার নাম দিয়েছেন রবিউল মডার্ন ট্রল লিমিটেড। স্থায়ী-অস্থায়ী মিলে ৫০ জনের মতো কাজ করেন তাঁর কারখানায়।

 জাহাজের ইঞ্জিনের অশ্বশক্তি, প্রশস্ততা ও দৈর্ঘ্য জেনে নকশা তৈরি করেন। এরপর জালের ফেব্রিকস কেটে ২২ ধরনের সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাছ ধরার উপযোগী করে জাল তৈরি করেন। সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এসব জাল লম্বায় ৪০৫ থেকে ৪৮০ ফুট। নকশা তৈরি করে সংযোজন করে একেকটি সম্পূর্ণ জাল তৈরি করতে সময় লাগে এক থেকে দুই সপ্তাহ। এভাবে রবিউল এখন বছরে ১০০টির মতো নতুন জাল তৈরি করতে করেন। এ ছাড়া মেরামত করেন কমপক্ষে তিন শতাধিক। 

চট্টগ্রাম শহরের সদরঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদী পেরোলে মৎস্য বন্দর ঘাট। সেই ঘাটের পাশেই রবিউলের কারখানা ও গুদাম। গত ২৮ অক্টোবর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিকদের তুমুল ব্যস্ততা। জাল নেওয়ার জন্য এসেছেন জাহাজমালিকের প্রতিনিধিরা। রবিউল তাঁদের হাতে জাল তুলে দিচ্ছেন।

সামুদ্রিক মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাছ ধরার জাহাজ আছে ২৫৫টি। নিয়মিত মাছ ধরায় নিয়োজিত ২২০টি। রবিউল জানান, এর মধ্যে ১৪০টি জাহাজেই জাল সরবরাহ করেছেন তিনি।

রবিউলের জালের বিশেষত্ব নিয়ে ডেক ও ইঞ্জিনকর্মী প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সাবেক ক্যাডেটদের কল্যাণ সমিতি— ডিইপিটিসির সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ সিরাজুল করিম বলেন, রবিউলের নকশায় তৈরি করা জালে জাদু আছে। পানি কাটে বেশি, চওড়া ও হালকা। ফলে মাছ ধরা পড়ে বেশি। আবার জাহাজের ইঞ্জিনে চাপ পড়ে কম।