সীমান্তে ‘পুশ ইন’: কূটনৈতিক কাঠামোর সদ্ব্যবহার করা উচিত

এম হুমায়ুন কবীর

সীমান্তে ‘পুশ ইনের’ মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ একটা মানবিক সংকট তৈরি করছে, যার কোনো যুক্তিসংগত কারণ এ মুহূর্তে নেই। এত লোকজন সীমান্তে আসছেন, বাংলাদেশ তাঁদের গ্রহণ করছে না, তাঁরা ভারতেও ফেরত যেতে পারছেন না। অথবা গেলেও তাঁদের ডিটেনশন সেন্টার বা বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে থাকতে হচ্ছে। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কারও দিক থেকেই এটা করা বাঞ্ছনীয় নয়। এর শুরুটা করেছে ভারত, ফলে দায়িত্বটাও তাদের ওপর থাকবে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের দিল্লি ও পশ্চিমবঙ্গ—এই দুই জায়গার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন নীতিগত অবস্থান দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেসব অনিয়মিত লোকজন আছেন, তাঁদের বিষয়টিকে পারস্পরিকভাবে সুরাহা করার জন্য একটা দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক কাঠামো আছে। দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলছেন, এই কাঠামোর ভিত্তিতে তাঁরা কাজ করতে আগ্রহী। তাঁর কথা যুক্তিসংগত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকে ভিন্ন রকম বিষয় দেখা যাচ্ছে। তারা বলছে, তারা চিহ্নিত করবে, বাতিল করবে, তারপর বিতাড়িত করবে। কূটনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে তারা একটা প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে এই লোকগুলোকে বাংলাদেশ ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকার এই সংকটটা শুরু করেছে। নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রশাসনিকভাবে লোকগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা, এর ফলে একটা মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। আমি ভারত ও বাংলাদেশ—দুই পক্ষকে অনুরোধ করব, প্রতিষ্ঠিত কূটনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে এ বিষয়টা সমাধানের জন্য তৎপর হওয়া প্রয়োজন। এর বাইরে কোনো উদ্যোগ নিতে গেলে সেটা যে মানবিক সংকট তৈরি করে, দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করে, সেটা তো ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব এ দেশের সরকারের এবং বর্তমান সরকার সেই কাজটা করছে। ভারতের দিক থেকে যদি এ বিষয়ে কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে কূটনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে তারা সেটা করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের তখন দায়িত্ব হবে এটা যাচাই–বাছাই করে দ্রুত জবাব দেওয়া, যাতে দুই পক্ষই আলাপ–আলোচনার মাধ্যমে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারে। কিন্তু এখন যেভাবে গায়ের জোরে বা ধাক্কাধাক্কি করে লোকজনকে ঠেলে পাঠানো হচ্ছে, তা কূটনৈতিক কাঠামো নয়, এটা দুই দেশের সম্পর্কের মাধ্যমও নয়। এতে করে উত্তেজনা বাড়ছে। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় স্থানীয় মানুষও এখন বিজিবির সঙ্গে মিলে এ কাজে নামছে। সীমান্ত এলাকার জনগণ যখন এ কাজে নেমে যায়, তখন এটা একটা উত্তেজনাকে সংঘাতে রূপান্তরের আশঙ্কাও তৈরি করে।

ভারত ও বাংলাদেশ যেহেতু প্রতিবেশী, যেহেতু দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক কাঠামো আছে, সেটারই সদ্ব্যবহার করা উচিত বলে আমি মনে করি। এর বাইরে গিয়ে অন্য কোনো উদ্যোগ নিলে সেটা ইতিবাচকতার চেয়ে নেতিবাচকতার দিকে বেশি যাওয়ার একটা আশঙ্কা আছে। দুই দেশের স্বার্থেই এ বিষয়টা এড়িয়ে চলা বা এ ধরনের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকাটা খুবই জরুরি।

এম হুমায়ুন কবীর: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং সভাপতি, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)।