কোন জাদুবলে ১৩ বছর তাঁরা

২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা ওয়াসার এমডি হন এই তিন প্রকৌশলী।

তাঁদের সংস্থার সেবার মান নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। নিজেদের অব্যবস্থাপনার দায় জনগণের ঘাড়ে চাপাতে বছর বছর পানির দাম বাড়িয়েছেন। পদ ধরে রাখতে আশ্রয় নিয়েছেন অনিয়মের। এভাবে ১৩ বছর ধরে বসে আছেন নিজ নিজ সংস্থার শীর্ষ পদে।

এই তিন কর্মকর্তা হলেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান, চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি এ কে এম ফজলুল্লাহ এবং খুলনা ওয়াসার এমডি মো. আবদুল্লাহ।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার বছরখানেকের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা ওয়াসার এমডি পদে বসেন এই তিন প্রকৌশলী। তারপর থেকে প্রভাব খাটিয়ে চার থেকে সাতবার পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন তাঁরা। এ তিন সংস্থার ইতিহাসে এত দীর্ঘ সময় কেউ এমডির চেয়ারে থাকতে পারেননি।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে ১৩ বছরে ১৪ বার এবং খুলনায় গত সাত বছরে ছয়বার পানির দাম বাড়ানো হয়েছে।
সরকার ‘নানা সুবিধার’ কথা চিন্তা করে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের ওয়াসার পদে বসায়। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সরকার তোয়াক্কা করে না। এমডিরা অনৈতিকভাবে বোর্ড সদস্যদের ওপর প্রভাব খাটান।
আদিল মুহাম্মদ খান, নগর গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক

১৯৯৬ সালের ওয়াসা আইন অনুযায়ী ওয়াসা পরিচালিত হয়। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হচ্ছেন এমডি। আইনে এমডি পদে একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ কতবার বা কত বছর থাকতে পারবেন, সে বিষয়ে কিছু বলা নেই।

ওয়াসা বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এমডি নিয়োগ দেয় সরকার। তাঁদের বেতন–ভাতা নির্ধারণ করে বোর্ড। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি নিয়ে ওয়াসা বোর্ড গঠিত হয়।

নগর গবেষণা ও নীতিবিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার ‘নানা সুবিধার’ কথা চিন্তা করে আস্থাভাজন ব্যক্তিদের ওয়াসার পদে বসায়। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও সরকার তোয়াক্কা করে না। এমডিরা অনৈতিকভাবে বোর্ড সদস্যদের ওপর প্রভাব খাটান।

৮০ বছরেও এমডি

এ কে এম ফজলুল্লাহ ২০০৯ সালের ৬ জুলাই চট্টগ্রাম ওয়াসার চেয়ারম্যান পদে এক বছরের জন্য নিয়োগ পান। পরে আরও এক বছর বাড়ানো হয়। ২০১১ সালে ঢাকা ওয়াসার আদলে চট্টগ্রাম ওয়াসায় এমডির পদ তৈরি করা হয়। তখন এমডি পদে নিয়োগ পান ফজলুল্লাহ। ১৯৯৮ সালে অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তার বয়স এখন ৮০ বছর।

সর্বশেষ ২০২০ সালের ১ অক্টোবর তিন বছরের জন্য ফজলুল্লাহকে নিয়োগ দেয় সরকার। তাঁকে পুনর্নিয়োগের সুপারিশ করেছিল যে বোর্ড, তার চেয়ারম্যান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের (ইউএসটিসি) উপাচার্য মো. জাহাঙ্গীর আলম। অভিযোগ রয়েছে, তাঁকে চেয়ারম্যান করতে ফজলুল্লাহর ভূমিকা ছিল।

ওয়াসার নথিপত্র অনুযায়ী, শুরুতে ফজলুল্লাহ মাসে ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা সম্মানী পেতেন। ২০১৬ সালে তিনি বেতন-ভাতা বৃদ্ধির আবেদন করলে তাঁর মোট বেতন নির্ধারণ করা ২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। এরপর তিনি মূল বেতন সাড়ে চার লাখ টাকা করার আবেদন করলে তা যাচাই–বাছাই করে প্রতিবেদন দিতে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

বর্তমান এমডির ১৩ বছরের আমলে চট্টগ্রাম ওয়াসা ১৪ বার পানির দাম বাড়িয়েছে। ২০১৩ সালে আবাসিক সংযোগে প্রতি ইউনিট (এক হাজার লিটার) পানির দাম ছিল ৬ দশমিক ৫৮ টাকা। এখন সে পানির দাম ১৮ টাকা, বাণিজ্যিকে ৩৭ টাকা।

বিতর্কের পরও টানা ছয়বার নিয়োগ

তাকসিমের টানা ছয়বার নিয়োগ, তাঁর মাধ্যমে অন্যদের নিয়োগসহ নানা অনিয়ম ও বিতর্ক রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। তাঁর ভয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মুখ খোলেন না।

২০০৯ সালে ওয়াসার এমডি নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিতে পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশনে অথবা সিনিয়র পর্যায়ে সাধারণ প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ২০ বছরের আবশ্যিক অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়। ওই সময় তাকসিমের এ–সংক্রান্ত কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তবু তিনি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তখন তাঁর মোট মাসিক বেতন ছিল ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে তাঁর বেতন সর্বসাকল্যে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা।

এমডির বেতন-ভাতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ওয়াসার পানির দাম। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আবাসিক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট পানির দাম ছিল ৬ টাকা ৪ পয়সা। এখন একই পরিমাণ পানির দাম ১৫ টাকা ১৮ পয়সা। ১৩ বছরে ১৪ বার পানির দাম বাড়ানো হয়েছে।

প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো, ঠিকাদার নিয়োগে সিন্ডিকেট, ঘুষ লেনদেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসহ বিস্তর অভিযোগ তাকসিমের বিরুদ্ধে। গত বছর ওয়াসার ১১টি দুর্নীতিগ্রস্ত খাত চিহ্নিত করে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দিয়েছিল দুদক। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে দুই সদস্যের দল গঠন করা হয়েছে।

নিজের মতো শর্ত তৈরি

২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত খুলনা ওয়াসার এমডি পদে ২০০৯ সালের ২৫ অক্টোবর বসেন মো. আবদুল্লাহ। তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। পদে থাকতে এমডি নিয়োগের বয়সসীমায় ইচ্ছামতো শর্ত দেন।

মো. আবদুল্লাহ ওয়াসা থেকে প্রতি মাসে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বেতন পান। আয়কর ও অন্যান্য সরকারি খরচ বাদ দিয়ে তিনি ২ লাখ ১৬ হাজার টাকা উত্তোলন করেন।

মোটা বেতন নিয়ে নিজের সেবা ঠিক রাখলেও ভোক্তাদের সেবা দিতে পারছেন না। খুলনা ওয়াসার সরবরাহ করা পানি লবণাক্ত। শুষ্ক মৌসুমে সুপেয় পানির প্রকট ঘাটতি দেখা দেয়। তবু সাত বছরে ছয় দফা পানির দাম বাড়ানো হয়েছে। গত ১ সেপ্টেম্বর সর্বশেষ পানির বর্ধিত দাম কার্যকর করেছে সংস্থাটি। নতুন মূল্য অনুযায়ী, আবাসিকে প্রতি ইউনিট পানির দাম ৮ টাকা ৯৮ পয়সা। আর বাণিজ্যিক গ্রাহককে দিতে হচ্ছে ১৪ টাকা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) খুলনা শাখার সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আজম বলেন, কোন জাদুবলে এমডির মেয়াদ বাড়ে, এটি বড় বিস্ময়। বছরে তিন মাস ওয়াসার পানি লবণাক্ত থাকে। ওই তিন মাস সংরক্ষিত পানির সঙ্গে লবণাক্ত পানি মিশিয়ে বিক্রি করে, যা গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা।