বিশেষ সাক্ষাৎকার

হাম নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ

টিকাদানের ক্ষেত্রে সফল হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশে হামে এত সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। টিকাদানের সফলতার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পার্থ শঙ্কর সাহা

প্রথম আলো:

প্রতিবছর ইউনিসেফ বিশ্বের প্রায় অর্ধেক শিশুকে টিকা দিতে সহায়তা করে, যাতে তারা সুস্থভাবে বড় হওয়ার সুযোগ পায়। বাংলাদেশেও ইউনিসেফ প্রতিবছর লাখো শিশুর জন্য এই কাজ করছে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে সহায়তা করছে। বাংলাদেশে গণটিকাদানের এই সাফল্য কতটা?

ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া
ছবি: সংগৃহীত

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: ১৯৭৪ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই ইউনিসেফ তাদের কাজের কেন্দ্রে টিকাদানকে রেখেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল, প্রতিটি শিশু সে যেখানেই থাকুক, যেন জীবনরক্ষাকারী টিকা পায়। বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে ইপিআই চালুর পর থেকেই ইউনিসেফ সরকারকে ব্যাপক কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। ইউনিসেফ বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করে, যাতে প্রতিটি শিশু জীবনরক্ষাকারী টিকা পায়। এর জন্য তারা বৈশ্বিক ক্রয়ক্ষমতা, কারিগরি দক্ষতা এবং কমিউনিটি সম্পৃক্ততাকে একত্র করে। বাংলাদেশে এই অংশীদারত্ব বড় বড় সাফল্য এনে দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পোলিও নির্মূল, নতুন টিকা চালু এবং ধারাবাহিকভাবে টিকাদানের উচ্চ হার। ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশে পূর্ণ টিকাদান কাভারেজ ১৯৮০ সালের ২ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফ পোলিও নির্মূল, মাতৃ ও নবজাতকের টিটেনাস নির্মূল, হেপাটাইটিস বি নিয়ন্ত্রণ এবং এইচপিভি ও টিসিভি টিকার মতো নতুন টিকা চালু করতে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করে স্কুলভিত্তিক পুষ্টি, পানি ও স্যানিটেশন (ওয়াশ) কার্যক্রমের সঙ্গে টিকাদান যুক্ত করে সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। সংক্ষেপে শক্তিশালী সরকারি নেতৃত্ব, তথ্যভিত্তিক কৌশল, কমিউনিটির আস্থা, ইউনিসেফসহ অংশীদারদের সমন্বিত সহায়তার ফলে বাংলাদেশ গণটিকাদান দ্রুত সম্প্রসারণ করে প্রতিটি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনতে পেরেছে।

আরও পড়ুন
হামে আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যু। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

বাংলাদেশে সম্প্রতি হামের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর পেছনে সময়মতো হামের টিকাদানের ব্যর্থতার প্রশ্নটি আসছে বারবারই। সম্প্রতি এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেছিলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকার দেশে টিকা আনতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং তারা টিকা ক্রয়ের পদ্ধতিও পরিবর্তন করেছিল।’ তাহলে কি অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফের সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই টিকাদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন এনেছিল?

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: বিশ্বব্যাপী টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ইউনিসেফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউনিসেফ শতাধিক দেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করে। বাংলাদেশ সরকার-ইউনিসেফের একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হয়ে আসছে, যার ফলে সময়মতো, সাশ্রয়ী এবং সমতাভিত্তিকভাবে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।

২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার বিষয়টি বিবেচনার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদারেরা তখন উদ্বেগ জানায় যে এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে এগোনোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। দুঃখজনকভাবে, এ সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে। ২০২৫ সালে ইউনিসেফ আগাম অর্থায়নের ব্যবস্থা করে টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ নিশ্চিত করে, যাতে তীব্র সংকট মোকাবিলা করা যায়। এর ফলে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কিছু টিকার মজুত বজায় রাখা সম্ভব হয়।

তবে কিছু টিকার ক্ষেত্রে এর আগেই মজুত শেষ হয়ে যায় এবং কিছু টিকার ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থছাড়ে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে টিকা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয়। কারণ, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন করা যায়নি এবং অন্তর্বর্তী সরকার ইউনিসেফকে বরাদ্দ দেওয়া অর্থও ছাড় করতে পারেনি।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউনিসেফ ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে মার্চ মাসে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বাতিলের নির্দেশ দেন। এরপর এপ্রিলে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে আগের পদ্ধতিতে টিকা সংগ্রহে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

সরকারি সহযোগিতা না থাকলে কোনো সম্ভাব্য স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফের নিজস্ব কি কোনো ব্যবস্থা রয়েছে?

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: সরবরাহে বিঘ্ন এড়াতে ইউনিসেফ একটি বিশেষ প্রিফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা বজায় রাখে, যার মাধ্যমে সরকার অর্থছাড়ে বিলম্ব হলে তা সাময়িকভাবে পূরণ করা যায়। এ জন্য ইউনিসেফ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করে, যাতে টিকার মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যায় এবং টিকাদান কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৫ সালে ইউনিসেফ প্রায় ১৮ মিলিয়ন (১ কোটি ৮০ লাখ) মার্কিন ডলার আগাম অর্থায়ন করেছে। এ ছাড়া ২০১৭-১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) ডলার ব্যয় করা হয়েছে টিকা সরবরাহ বজায় রাখতে।

সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাবের সময় ইউনিসেফের সদর দপ্তর তাদের বৈশ্বিক জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে অতিরিক্ত কারিগরি দক্ষতা ও জরুরি তহবিল জোগাড় করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদার ও দাতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে জাতীয় পর্যায়ে হাম মোকাবিলা এবং এ ধরনের জরুরি পরিস্থিতির জন্য অতিরিক্ত সম্পদ নিশ্চিত করা হয়।

শিশুকে দেওয়া হচ্ছে হামের টিকা। সিটি করপোরেশন চত্বর, রংপুর, ২০ এপ্রিল
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ইউনিসেফ ও গ্যাভি যৌথভাবে ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট থেকে সংগৃহীত টিকা বাংলাদেশে সরবরাহ করত, কিন্তু গত বছর হঠাৎ এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ সিদ্ধান্ত কি অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে একটি ভালো নীতি ছিল? এ থেকে অন্য দেশগুলো কী শিক্ষা নিতে পারে—এটি কি বিশ্বব্যাপী একটি সতর্কবার্তা?

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: ইউনিসেফ ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটসহ ইউরোপ, জাপান ও এশিয়ার বিভিন্ন প্রস্তুতকারকের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বজায় রাখে, যারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত টিকা উৎপাদন করে। এসব ব্যবস্থার আওতায় ১৯৭৯ সালে ইপিআই কর্মসূচি শুরুর পর থেকেই ইউনিসেফ সরাসরি এসব প্রস্তুতকারকের কাছ থেকে টিকা সংগ্রহ করে আসছে, যাতে গুণগত মান, নির্ভরযোগ্যতা এবং সর্বনিম্ন দামে সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ক্রয় নীতিমালা পরিবর্তনের ফলে টিকা সরবরাহব্যবস্থায় কীভাবে প্রভাব পড়ে এবং টিকার ঘাটতি তৈরি হয়, তা আগেই আমি বলেছি।

প্রথম আলো:

চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই দেশে প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়। তখন কি সংক্রমণ ঠেকাতে ও স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে অন্তর্বর্তী সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছিল? জানুয়ারির পর দুই মাস পেরিয়ে গেলে প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকে, এ ক্ষেত্রে সরকার কি দেরিতে ব্যবস্থা নিয়েছে বলে মনে করেন?

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: হামের রোগীর তথ্য প্রকাশে বিলম্ব বাংলাদেশের রোগ নজরদারি ও প্রতিবেদনব্যবস্থার বড় দুর্বলতাটি তুলে ধরে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে টিকার ঘাটতি, রোগ নজরদারির বিলম্বিত প্রতিবেদন এবং জনগোষ্ঠীর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে ভিটামিন এ ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় ধাপ পরিচালনা করতে না পারা।

২০২৬ সালের মার্চের শেষ দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফ আনুষ্ঠানিকভাবে হাম রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির তথ্য পায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সম্ভাব্য একটি ক্যাম্পেইনের জন্য ইউনিসেফ ২০২৫-এর সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই হামের টিকা সংগ্রহ করে রেখেছিল। মার্চের শেষ দিকে পরিস্থিতি জানার পর ইউনিসেফ দ্রুত এমআর (হাম-রুবেলা) ক্যাম্পেইন শুরুর পক্ষে জোরালোভাবে অবস্থান নেয়, যা শেষ পর্যন্ত গত ৫ এপ্রিল শুরু হয়।

প্রথম আলো:

একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেছেন, জাতীয় টিকাদান পরামর্শক কমিটি দেড় বছর আগে অন্তর্বর্তী সরকারকে সতর্ক করেছিল যে শিশুদের টিকা না দিলে হামের প্রাদুর্ভাব হতে পারে। টিকা সংগ্রহ বন্ধ হয়ে গেলে ইউনিসেফ কি কোনো সতর্কবার্তা দিয়েছিল?

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: হ্যাঁ, ইউনিসেফ একাধিকবার অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছে।

প্রথম আলো:

আপনাকে ধন্যবাদ।

স্ট্যানলি গুয়াভুইয়া: আপনাকেও ধন্যবাদ।