পথশিশুদের ‘লুসিও ভাই’ যেদিনের আশায়, সেদিন কি আসবে
কেউ যখন ছোট্ট শিশুকে ফুটপাতে বসে কিছু বিক্রি করতে দেখে, তখন তাঁর চোখে কী ধরা পড়ে?—হয়তো ক্ষুধার আঁচ, হয়তো নিঃশব্দ কষ্ট। ইতালির নাগরিক ব্রাদার লুসিও বেনিনাতির চোখে ধরা পড়া সেই ক্ষুধা আর কষ্টগুলোকে লাঘব করাই তাঁর জীবনের ব্রত বানিয়েছেন। শিশুদের জন্য ভালোবাসা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তাই ৭০ ছুঁই ছুঁই বয়সেও তিনি এ দেশের অনেক শিশুর কাছে ‘লুসিও ভাই’ নামেই পরিচিত।
দীর্ঘদিন কাজ করে আসার পর লুসিও বেনিনাতি পথশিশুদের জন্য আর কাজ করতে চান না। আসলে তিনি এমন স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে পথশিশুদের নিয়ে তাঁর কাজ করার প্রয়োজনই পড়বে না। তিনি চান, শুধু বাংলাদেশ নয়, কোনো দেশের শিশুকেই যেন আর পথে থাকতে না হয়।
গাজা, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে শুধু যুদ্ধ, হানাহানি আর মারামারি। শিশুরা তো ভালো থাকতে পারছে না। সামনে ভালো থাকবে, সে ধরনের কোনো আশাও করা যাচ্ছে না। চারপাশে বড় গন্ডগোল চলছে।ব্রাদার লুসিও বেনিনাতি
এবার তিন বছর পর বাংলাদেশে আসার পর গত ১২ জানুয়ারি কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে বসে তিনি জানান এই স্বপ্নের কথা। নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে লুসিওর চোখে ঝিলিক ধরে এক মুহূর্তের জন্য, তারপর ভাঙে। তিনি বলেন, গাজা, ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে শুধু যুদ্ধ, হানাহানি আর মারামারি। শিশুরা তো ভালো থাকতে পারছে না। সামনে ভালো থাকবে, সে ধরনের কোনো আশাও করা যাচ্ছে না। চারপাশে বড় গন্ডগোল চলছে।
ব্রাদার লুসিও ইতালির মিলানভিত্তিক পন্টিফিক্যাল ইনস্টিটিউট ফর ফরেন মিশনসের একজন ক্যাথলিক মিশনারি। বাংলাদেশে যখন ছিলেন, তখন অধিকাংশ সময় তিনি রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে থাকতেন। এবার বয়স ও নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পন্টিফিক্যাল ইনস্টিটিউট ফর ফরেন মিশনস পরিচালিত একটি আবাসনে থাকছেন।
রাস্তায় হারানো হাসির খোঁজে
পথশিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন ব্রাদার লুসিও। পথে নেমে শিশুদের মুখের হাসি যেন ফুরিয়ে না যায়, তাই পথশিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে বাস-লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন, ফুটপাত, পার্কে থাকা শিশুদের জন্য ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি। বাংলাদেশের পাশাপাশি ব্রাজিলেও পথশিশুদের নিয়ে তিনি কাজ করেন।
মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে শিশুরা কেন মানবেতর জীবন কাটাবে? কেন পথে থাকতে হবে? এদের প্রতি সমাজের অন্যদের কোনো দায় নেই? তাদের নাম কেন পথশিশু হবে? কেন মাদক নেবে তারা? স্নেহ ও ভালোবাসা পেলে তারা কি সমাজের মূলস্রোতে মিশতে পারে?—এমন নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন ব্রাদার লুসিও।
সংখ্যার ভেতর মানুষের গল্প
২০২৩ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পথশিশুদের জরিপ ২০২২ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ইউনিসেফের সহায়তায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭ হাজার ২০০ পথশিশুর ওপর এই জরিপ চালানো হয়। তবে দেশে কতসংখ্যক পথশিশু আছে, তা জরিপে উঠে আসেনি।
জরিপ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পথশিশুদের গড় বয়স ১২ দশমিক ৩ বছর। দেশে প্রতি একটি মেয়ে পথশিশুর বিপরীতে চারটি ছেলে পথশিশু আছে। পথশিশুদের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ৯ শতাংশ এসেছে ময়মনসিংহ জেলা থেকে। আর দেশের মোট পথশিশুর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৪৮ শতাংশ পথশিশু অবস্থান করছে। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪১ শতাংশ পথশিশুর বসবাস।
বাংলাদেশে বাস-লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশন, ফুটপাত, পার্কে থাকা শিশুদের জন্য ‘পথশিশু সেবা সংগঠন’ নামে একটি সংস্থার মাধ্যমে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন ব্রাদার লুসিও। বাংলাদেশের পাশাপাশি ব্রাজিলেও পথশিশুদের নিয়ে কাজ করেন তিনি।
বিবিএসের জরিপ প্রতিবেদন বলছে, দেশের প্রায় সব পথশিশু তাদের কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে নির্যাতনের শিকার হয়। নির্যাতনের শিকার পথশিশুর হার প্রায় ৯৬ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ পথশিশু শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়। প্রায় ৪৪ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু মৌখিক হুমকির শিকার হয়। এ ছাড়া কাজ থেকে ছাঁটাই, মজুরি কমিয়ে দেওয়া—এসব ঘটনাও ঘটে। বেশির ভাগ পথশিশু সপ্তাহে ১ হাজার টাকা বা ১০ ডলারের কম অর্থের জন্য প্রতি সপ্তাহে ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করছে।
ভালোবাসায় বদলে যাওয়া জীবন
কত শিশুর জীবন এ পর্যন্ত পাল্টে দেওয়া সম্ভব হয়েছে—এমন প্রশ্নে ইতালির নেপলসের বাসিন্দা ব্রাদার লুসিও বলেন, ‘আমরা কাজের মধ্য দিয়ে শিশুদের ভালোবাসা খুঁজি। এটা কোনো কোম্পানি নয়, তাই হিসাব রাখি না কত জীবন পাল্টে গেছে। আমরা শুধু শিশুদের বুঝতে শেখাই যে তারাও এ সমাজের একজন। ওদের পথ দেখাই। আর আশপাশের মানুষের মনে ওদের জন্য যেন ভালোবাসা জন্মায় সে চেষ্টা করি।’
এরপর হাসিমুখে সৌরভ, রবি, নাঈমসহ একাধিক জনের নাম বলতে থাকেন লুসিও। বড় হয়ে কে কোথায় কাজ করছেন, তা–ও জানালেন। রবি বিয়ে করেছেন, সৌরভ তাঁর পরিবারকে খুঁজে পেয়েছে। কেউ হয়তো নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করছেন। কেউ ব্যবসা করছেন—এমন তথ্য দিয়েছেন ব্রাদার লুসিও।
পথশিশু সেবা সংগঠনে এ পর্যন্ত প্রায় ৯৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেছেন। ব্রাদার লুসিও বলেন, এই স্বেচ্ছাসেবীদের পাওয়াটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বেচ্ছাসেবী পাওয়া যায় না বলে সিলেট ও চট্টগ্রামে কাজ শুরু করেও আবার তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। অর্থের চেয়েও এটা বড় সমস্যা বলে জানিয়েছেন তিনি।
নতুন জীবন, নতুন নাম
ব্রাদার লুসিও যে সৌরভের নাম বলেছেন, তাঁর সঙ্গে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে মুঠোফোনে কথা হলো। জন্মনিবন্ধন সনদ অনুযায়ী সৌরভের বয়স এখন ১৯ বছর। মাত্র ৮ বছর বয়সে হারিয়ে গিয়েছিলেন। এরপর তামিম বিশ্বাস থেকে নিজের নাম পাল্টে সৌরভ রেখেছিলেন।
কমলাপুর স্টেশনে কুলির কাজ করার সময় ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে দুই পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন সৌরভ। পরে একটি পা কেটে ফেলতে হয়। পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) সহায়তায় কৃত্রিম পা পেয়েছেন তিনি। পাশাপাশি ফিরে পেয়েছেন তাঁর হারিয়ে যাওয়া পরিবার। বর্তমানে তিনি সিআরপিতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। নিজে ইলেকট্রনিকসের একটি দোকান দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কারও টাকায় ‘ময়লা’ (দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা উপার্জন) থাকলে তাঁর টাকাও নেওয়া হয় না। ময়লা যন্ত্র দিয়ে তো আর ভালো কাজ করা যায় না।ব্রাদার লুসিও বেনিনাতি
গত বছর সৌরভের দল জাতীয় হুইলচেয়ার বাস্কেটবল চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সৌরভের জীবনের এই পরিবর্তনের পেছনের কারিগর ছিলেন লুসিও এবং তাঁর সংগঠন।
মুঠোফোনে সৌরভ বলেন, ‘লুসিও ভাই ও অন্য ভাইয়া–আপুরা না থাকলে তো আমি কমলাপুর স্টেশনেই শুইয়া থাকতাম। এই পর্যন্ত আর আসতে পারতাম না।’
লুসিও ভাইয়ের সঙ্গে ছোটবেলার কোনো ছবি নেই সৌরভের, তবে স্মৃতিতে জ্বলজ্বল; তিনি বললেন, ‘লুসিও ভাই বাচ্চাদের সঙ্গে খেলত, আনন্দ করত। গল্পের বইও কিনে দিছিল।’
আর্থিক সহায়তায় সততা
ঘুষখোর, নিপীড়ক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা নেয় না ব্রাদার লুসিওর পথশিশু সেবা সংগঠন।
আর্থিক সহায়তা পাওয়া প্রসঙ্গে ব্রাদার লুসিও বলেন, যে ব্যক্তি ঘুষ নেন, নিপীড়ক, কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি—এমন কারও কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা নেওয়া হয় না। আর্থিক সহায়তা দিতে পারেন শুধু ‘সচেতন’ বাংলাদেশিরা।
পথশিশুদের ‘লুসিও ভাই’ আরও বলেন, সহায়তা করার পর কোনো ব্যক্তি যদি এক বছরের মধ্যে আর কোনো খোঁজ না নেন, তখন ওই ব্যক্তিকে ডেকে তাঁর দেওয়া সহায়তার টাকা ফেরত দেওয়া হয়। কেননা আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি দায়বদ্ধতাও তো থাকতে হবে। কারও টাকায় ‘ময়লা’ (দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা উপার্জন) থাকলে তাঁর টাকাও নেওয়া হয় না। ময়লা যন্ত্র দিয়ে তো আর ভালো কাজ করা যায় না।
সংগঠনটি বর্তমানে রাজধানীর গুলিস্তান ও কমলাপুরে সপ্তাহে দুই দিন দুই ঘণ্টা করে শিশুদের সেবা দিচ্ছে। ব্রাদার লুসিওসহ অন্যরা শিশুদের সঙ্গে নানা খেলায় মেতে থাকেন। কখনো সবাই মিলে ছবি আঁকেন। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা, গল্প বলা, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কারও হাসপাতালে ভর্তি করতে হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ব্রাদার লুসিও নিজেই আঘাত পাওয়া শিশুদের ক্ষতস্থান পরিচর্যা করেন।
সমাজসেবার নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা শিশু সেবা সংগঠনের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য জোবায়ের আহমেদ শামীম এ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত আছেন ১০ বছর ধরে। তিনিও প্রথম আলোতে ব্রাদার লুসিওর সঙ্গে এসেছিলেন। জানালেন, তাঁদের সংগঠনের কার্যালয়ের ভাড়া দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক।
‘আলো’র যাত্রা
লুসিও বেনিনাতি নামের অর্থ জানতে চাইলে ব্রাদার লুসিও হাসতে হাসতে বলেন, ‘লুসিও মানে আলো, বেনিনাতি মানে ভালো। আমি টর্চের আলোর মতো শিশুদের জীবনে একটু আলো দেওয়ার চেষ্টা করছি। চারপাশের মানুষকে বলি, এসো, এই শিশুদের পাশে দাঁড়াও। সবাই এগিয়ে না এলে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব নয়।’
ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার লুসিও প্রথম বাংলাদেশে আসেন ১৯৮৮ সালে। দিনাজপুরের একটি কারিগরি স্কুলে চাকরি করতেন। দিনাজপুর ও ময়মনসিংহের রেলস্টেশনগুলোতে কাজ করেছেন। পরে পথশিশুদের সেবা করার বিষয়টি তাঁর মাথায় আসে। আট ভাই ও দুই বোনের মধ্যে এক ভাই মারা গেছেন। মা–বাবা মারা গেছেন অনেক আগেই।
লুসিও ভাই ও অন্য ভাইয়া–আপুরা না থাকলে তো আমি কমলাপুর স্টেশনেই শুইয়া থাকতাম। এই পর্যন্ত আর আসতে পারতাম না।সৌরভ, জাতীয় হুইলচেয়ার বাস্কেটবল চ্যাম্পিয়নশিপে চ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য
ব্রাদার লুসিও বলেন, জীবনে একজনকে পছন্দ করলেও তা বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। এরপর আর এ পথে হাঁটেননি। ৯ বছর বয়স থেকে দোকানে কাজ করেছেন। সেনাবাহিনীতেও যোগ দিয়েছিলেন। কুষ্ঠরোগের চিকিত্সা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি।
ব্রাজিলের সাও পাওলো থেকে বাংলাদেশে আসা–যাওয়া করেন ব্রাদার লুসিও। এবারই তিন বছর মানে দীর্ঘ সময় পরে বাংলাদেশে এলেন। জানালেন, তিনি না থাকলেও সংগঠনের কাজে কোনো সমস্যা হয় না, স্বেচ্ছাসেবকেরাই দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৭ সাল থেকে ঢাকায় কাজ শুরু করা ব্রাদার লুসিও বাংলা বলতে পারেন। ২০০৯ সালে প্রথম আলোর সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ ইকবাল হোসাইন চৌধুরীর লেখা ‘লুসিও বেনিনাতি, সেবাতেই সুখ’ শিরোনামের একটি মূল প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ব্রাদার লুসিও বলেন, প্রথম আলোতে ওই লেখা প্রকাশের পর অনেকেই এই শিশুদের নিয়ে কাজের বিষয়টি জানতে পেরেছিলেন।
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে অনেক দিন আগে আবেদন জমা দিয়ে রেখেছেন তিনি। কিন্তু এখনো কোনো উত্তর আসেনি। এই দেশে শিশুদের নিয়ে কাজ করায় স্বস্তি থাকলেও এই উত্তর না পাওয়ার আক্ষেপও আছে ব্রাদার লুসিওর মনে।