প্রায় দুই মাস পরে দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশের মিশন থেকে ভারতের নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার কার্যক্রম আবার চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। দিল্লি ও আগরতলা থেকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ তুলে গত ডিসেম্বরে দিল্লি, কলকাতা, আগরতলায় বাংলাদেশের মিশন ঘিরে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করে। এই প্রেক্ষাপটে ২২ ডিসেম্বর দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং আগরতলায় বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশন অনিবার্য কারণে ভারতের নাগরিকদের জন্য ভিসা ও কনস্যুলার সেবা সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
এর আগে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করে আসছে ভারত। গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশিদের ভিসা সেবা স্বাভাবিক করার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে গতকাল ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেন। ভিসা সহজ করার সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতির প্রথম ধাপ হতে চলেছে কি না, এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেন, সে দেশে (বাংলাদেশে) একটা নতুন সরকার এসেছে। সম্পর্কের উন্নতিতে সব বিষয় নিয়েই নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ভারত চায় দুই দেশের ঐতিহাসিক ও বহুমুখী সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিন পর ভারতীয়দের জন্য বাংলাদেশের ভিসা সেবা চালুর সিদ্ধান্ত এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সম্পর্কোন্নয়নে কাজ করবে ভারত
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভারত সরকারের কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছিল। দীর্ঘদিন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থন বাংলাদেশে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। অপর দিকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ করে আসছে দিল্লি। এমন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে সম্পর্কে উত্তেজনা চলতে থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে তারা। ভোটের আগে থেকেই সম্পর্কের উন্নতি নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিতও দেওয়া হচ্ছিল।
গতকাল ব্রিফিংয়ে প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের আগ্রহের কথা জানিয়ে রণধীর জয়সোয়াল বলেন, নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে ভারত অপেক্ষায় রয়েছে। সব দিক বিবেচনা করে সম্পর্ককে কী করে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করতে ভারত আগ্রহী।
এ প্রসঙ্গে জয়সোয়াল আরও বলেন, নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের ভাবি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। শপথ গ্রহণের দিন ভারত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর লেখা চিঠি তুলে দেন। সেই চিঠিতে লেখা ছিল, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ দেখতে আগ্রহী। সেই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে ভারত যে অঙ্গীকারবদ্ধ, তা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। ওই অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি। তাঁর সফরসঙ্গী ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি আলোচনার সময় উপস্থিত ছিলেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোতে পরে যোগাযোগ করে জানা যায়, প্রায় আধঘণ্টার ওই আলোচনায় দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা হয়। সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতির লক্ষ্যে পারস্পরিক মর্যাদা, স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা হয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৮ মাসের অভূতপূর্ব টানাপোড়েন শেষে দুই পক্ষ সম্পর্কের উত্তরণের বিষয়ে একমত। এ বিষয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আগ্রহ লক্ষণীয়। এখন অপেক্ষায় থাকতে হবে দুই পক্ষ কতটা উদ্যোগী ভূমিকা নিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেবে।
বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পরদিন গত বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রেখে সকল দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাই।’