এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনা না কেনা বর্তমান সরকারের জন্য পরীক্ষা

ডিকাব টক অনুষ্ঠানে ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে। আজ মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবেছবি: প্রথম আলো

ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে হলে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে। তাই বিষয়টি বাংলাদেশ কীভাবে এগিয়ে নেবে, সেটি বর্তমান সরকারের জন্য একটি ‘ভালো পরীক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি।

আজ মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিকাব টক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এ কথা বলেন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত। ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিকাব) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে আলোচনা আর যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলের কাছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও দর–কষাকষি চলমান থাকায় এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রি নিয়ে এখনো ‘চিন্তিত নন’ বলে জানান তিনি।

ফ্রান্স কিংবা ইউরোপ কোনো চাপিয়ে দেওয়া সম্পর্কে বিশ্বাস করে না উল্লেখ করে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি সবার জন্য সমান সুযোগের ওপর জোর দিচ্ছি এবং এটা এমন এক বার্তা, সেটা বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কেননা আমরা মনে করি, এটা অত্যাবশ্যক। আমি মনে করি, এটা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার এবং বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।’

জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেছেন, কয়েক বছর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কারিগরি মূল্যায়ন ও গুরুত্বভেদে আলোচনার পর এয়ারবাস কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। বিমান বাংলাদেশের বহরে এয়ারবাস থাকাটা তাদের নিজেদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ও সুবিধাজনক ছিল। বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থা দুই ধরনের উড়োজাহাজ তাদের বহরে রাখে। তাদের এয়ারবাসও থাকে, আবার বোয়িংও থাকে।

এর ফলে কাউকে কোনো একটি একক কোম্পানির ওপর নির্ভর করে থাকতে হয় না উল্লেখ করে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, এতে দুই ধরনের উড়োজাহাজের সুবিধা তুলনা করে বেছে নেওয়া যায়। যেমন এমন একটি উড়োজাহাজ রয়েছে, যা ঢাকা থেকে কোনো বিরতি ছাড়াই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে পৌঁছাতে পারে। সেটি বোয়িং নয়, সেটি এয়ারবাস। বিশ্বে শুধু এই একটি উড়োজাহাজ তা করতে সক্ষম। তাই অনেক যৌক্তিক ও কারিগরি কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারবাসকে বেছে নিয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়।

জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, দেখলেই বোঝা যাবে, বিশ্বের কত শত বিমান সংস্থা এয়ারবাস ব্যবহার করছে। তাই বিমানের এই সিদ্ধান্তে কোনো সন্দেহ বা ভুল ছিল না। তাঁরা জানতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কিছু উড়োজাহাজ বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে, ২০৩১ বা ২০৩৫ সালের দিকে যা সরবরাহ করা হবে। এটা তাদের বাণিজ্যিক বিষয়। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এখনো এয়ারবাসের প্রতি আগ্রহ বজায় রেখেছে। এ নিয়ে আলোচনা এখনো চলছে।

এয়ারবাস নিয়ে আরেক প্রশ্নের জবাবে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা জানি এসব কাজে সময় লাগে। আমরা চাই, আলোচনাগুলো সবচেয়ে সুন্দর ও নিখুঁতভাবে শেষ হোক, যাতে পরে কেউ বলতে না পারে, কোনো ভুল ছিল বা আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। তাই এতে সময় লাগতেই পারে। তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, আলোচনা এখনো সঠিক পথেই এগোচ্ছে।’

বাংলাদেশের কাছে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ বিক্রির আলোচনায় ইতিবাচক ফল আসবে বলে আশাবাদী জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে। তিনি বলেন, ‘আমি কারিগরি আলোচনার বিশদ বিবরণ দেব না। কারণ, সেই অনুমতি আমার নেই। আমি এয়ারবাসের হয়ে সরাসরি চুক্তি আলাপকারী নই। এটি কোনো ফরাসি সরকারের চুক্তি নয় বা যুক্তরাজ্য সরকারের চুক্তি নয়, এটি সরাসরি এয়ারবাস কোম্পানির চুক্তি, যা যথাসময়ে বিমান ও এয়ারবাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত হবে। তাই আমি এটি নিয়ে একেবারে চিন্তিত নই। আমি অবশ্যই একটি সমান সুযোগের ওপর জোর দেব।’

ডিকাব টক অনুষ্ঠানে ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে। আজ মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে
ছবি: প্রথম আলো

এয়ারবাস বিক্রিকে ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, ‘কেন এটা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য ১০টি উড়োজাহাজ বড় চুক্তি নয়; কিন্তু এটা আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু। বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যাওয়ার জন্য আলোচনায় যুক্ত হতে বাংলাদেশ ইচ্ছুক। সে কারণে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা তুলে ধরে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘এটা এমন নয় যে শুধু এয়ারবাস বিক্রি করলাম, এরপর শেষ। এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীরদারত্বে যুক্ত হওয়া।’

ইউরোপকে বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমেরিকায় ১৭ শতাংশের বিপরীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৪৮ শতাংশ যায় ইউরোপে। এটা তিন অনুপাত এক। যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে এটা আরও বেশি। সুতরাং ইউরোপ হচ্ছে প্রধান অংশীদার। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘যখন আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করি, তখন কেবল একটা বিষয়ই স্মরণ করিয়ে দিই যে আমাদের অভিন্ন স্বার্থ হচ্ছে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। কেননা আপনার নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও আগ্রহী অংশীদার রয়েছে, যে আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়।’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে বলেন, ঢাকায় ওই ২৭টির দেশের মধ্যে শুধু ৭টি দেশের দূতাবাস রয়েছে। ভারত, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে এফটিএ বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে ইইউ। কিন্তু সেই মানচিত্রে বাংলাদেশ নেই বা যথেষ্ট পরিমাণে নেই।

ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, ‘সুতরাং আপনি যদি ওই মানচিত্রে আরও বড় পরিসরে থাকতে চান, তাহলে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। সেই বিবেচনায় এয়ারবাস গুরুত্ব বহন করে। কেননা এটা ইউরোপকে কেবল একটা বিকল্প হিসেবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা নয়; বরং সহযোগী হিসেবে বেছে নেওয়া যে আমরা ইউরোপে যাচ্ছি, আমরা জানি আপনারা আমাদের শ্রদ্ধা করবেন, আপনাদের সঙ্গে আমাদের স্বার্থ জড়িত।’

ডিকাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা ইমরুল কায়েস।