এক সপ্তাহে যুদ্ধ নিয়ে ভুয়া তথ্যই বেশি

যুদ্ধ চলছে মধ্যপ্রাচ্যে। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল জোট হামলা চালাচ্ছে ইরানে, পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরানও। ধ্বংস আর মৃত্যুর মধ্যে ভুয়া তথ্যও ছড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যাকে অপতথ্যের বন্যা অভিহিত করা হয়েছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে। বিবিসির মতো এএফপিও এই সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি বিপুলসংখ্যক ভিডিওর কথা তুলে ধরেছে তাদের প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের মধ্যে ছড়ানো ভুয়া তথ্যের দিকে নজর রাখছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই যুদ্ধ শুরুর পর এক সপ্তাহে চারটি প্রতিষ্ঠান যে ২০১টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করে, তার ৮৬টিই এই যুদ্ধ নিয়ে।

রিউমর স্ক্যানার, ডিসমিসল্যাব, ফ্যাক্ট ওয়াচ ও দ্য ডিসেন্ট এই সময়কালে যুদ্ধ নিয়ে যে ৮৬টি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা ওই সময় শনাক্ত হওয়া মোট ভুল তথ্যের ৪২ শতাংশ। একই সময় পাকিস্তান–আফগানিস্তান সংঘাত নিয়েও আরও পাঁচটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত রিউমর স্ক্যানার ভুল তথ্য শনাক্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ১৪২টি, ডিসমিসল্যাব ২৭টি, ফ্যাক্ট ওয়াচ ও দ্য ডিসেন্ট ১৬টি করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাদের ওয়েবসাইটে।

তার মধ্যে পুরোনো বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে ৭৮টি। সংবাদমাধ্যমের ফটোকার্ডের আদলে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়িয়েছে ৩৬টি। মন্তব্য বা বক্তব্যনির্ভর ভুল তথ্য ৩০টি। ভুয়া, অসত্য ও ভিত্তিহীন দাবি শনাক্ত হয়েছে ২৮টি। তা ছাড়া এআই–নির্ভর ছবি ও ভিডিও শনাক্ত করে ফ্যাক্ট চেক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে ২৪টি। সম্পাদিত ছবি শুধু ইমেজভিত্তিক ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে ৫টি।

ভিডিওভিত্তিক ভুল তথ্য বেশি

গত সপ্তাহে শনাক্ত ভুল তথ্যের মধ্যে ৭৮টি ভিডিওভিত্তিক, যা মোট শনাক্তের প্রায় ৩৮ শতাংশ। এসব ভিডিওর মধ্যে ছিল পুরোনো ভিডিও, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভিডিও এবং গেমিং ফুটেজ।

এর মধ্যে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হয়, এটি ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে আগুন লাগার সাম্প্রতিক দৃশ্য। যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি আবাসিক এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের সময় ধারণ করা।

আরেকটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হয়, ইরানের হামলার ভয়ে ইসরায়েলিরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি ফ্রান্সের ক্লিসোঁ শহরে অনুষ্ঠিত ‘হেলফেস্ট’ নামের একটি হেভি মেটাল সংগীত উৎসবে দর্শকদের প্রবেশের দৃশ্য।

আরেকটি ভিডিও টিকটকে ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হয়, এটি ইসরায়েলের ইরানে হামলার দৃশ্য। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২১ সালের মে মাসে গাজায় ইসরায়েলি হামলার সময় ধারণ করা ফুটেজ।

এ ছাড়া ‘ইসরাইলি যুদ্ধবিমান ধ্বংস করল ইরান’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। পরে জানা যায়, সেটি আসলে একটি ভিডিও গেমের দৃশ্য।

ভুয়া ফটোকার্ড

গত সপ্তাহে মূলধারার সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালগুলোর ডিজিটাল ফটোকার্ডের আদলে অন্তত ৩৬টি ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানো হয়েছে।

এর মধ্যে একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘টাকা দিয়ে খাদ্য কেনার থেকে না খেয়ে থাকা ভালো: বিদ্যুৎমন্ত্রী’—ডিবিসি নিউজের ডিজাইন ব্যবহার করে এটি প্রচার করা হয়। কিন্তু ডিবিসি নিউজ এমন কোনো সংবাদ প্রকাশ করেনি।

আরেকটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘সাত দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১০ হাজার অফিস চালু হবে’—আমার দেশ পত্রিকার ফটোকার্ডের নকশা ব্যবহার করে এটি প্রচার করা হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, এমন কোনো ফটোকার্ড আমার দেশ প্রকাশ করেনি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে ‘ইরান এভাবে পাল্টা হামলা শুরু করবে ভাবতে পারিনি’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ডও ছড়ানো হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, সেটি একটি স্যাটায়ার পেজের পোস্ট।

ভুয়া মন্তব্য ও বক্তব্য বিকৃত করে প্রচার

গত সপ্তাহে ৩০টি ভুল তথ্য শনাক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যা ছিল মন্তব্য বা বক্তব্যভিত্তিক। মন্তব্য বা বক্তব্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ নানা ব্যক্তির দাবি করা প্রচার করা হয়।

এর মধ্যে একটি পোস্টে দাবি করা হয়, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘জামায়াত ১৬৮ আসন পেত, ইঞ্জিনিয়ারিং করে ৬৮ করা হয়েছে।’

তবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুরো আলোচনায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর বক্তব্য উগ্রবাদী শক্তি নিয়ে ছিল, কোনো নির্দিষ্ট দল নিয়ে নয়।

এ ছাড়া এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার নামে ‘পুলিশ হত্যার ইস্যু নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে দুই দিনে দেশ অচল হবে’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্টকে সত্য দাবি করে প্রচার করা হয়েছে।

কাতারভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেল আল–জাজিরার নাম ব্যবহার করে একটি পোস্টে দাবি করা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিহত হয়েছেন। বাস্তবে এ ধরনের কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি। আল–জাজিরার নাম ব্যবহার করে বানোয়াট তথ্য ছড়ানো হয়েছে।

এআই ব্যবহার করে তৈরি ছবি ও ভিডিও

ফেসবুকে বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতি ও চাঁদাবাজি নিয়ে কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একটিতে দাবি করা হয়, বাজারে প্লাস্টিকের ডিম বিক্রি হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, ছবিগুলো বাস্তব নয়; এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি।

এ ছাড়া বাহরাইনে মার্কিন সেনারা পরিবারের উদ্দেশে কান্নাজড়িত ভিডিও বার্তা পাঠাচ্ছেন—এমন দাবিতে কয়েকটি ভিডিও ছড়ানো হয়। পরে দেখা যায়, ভিডিওগুলোও এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্যের দৃশ্য দাবিতে দুটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। যাচাইয়ে জানা যায়, ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।

ভুয়া দাবি ও প্রতারণা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ইউনিসেফ স্কুলে নিয়োগ—শিশুশিক্ষা প্রকল্প ২০২৬’ শিরোনামে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছড়ানো হয়। যাচাইয়ে দেখা যায়, ইউনিসেফ এমন কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেনি; প্রতারণার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি করা হয়েছে।

এই বিজ্ঞপ্তিতে আবার প্রথম আলো লোগো ব্যবহার করা হয়। কিন্তু প্রথম আলোয় এমন কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়নি।

এ ছাড়া পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান মুক্তি পেয়েছেন—এমন দাবিও ছড়ানো হয়। কিন্তু তিনি এখনো রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারেই রয়েছেন।

অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টির মৃত্যুর দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। কিন্তু কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়নি।

যাঁদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি অপপ্রচার

গত সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে। তাকে ঘিরে মোট ১৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যার বেশির ভাগই ভুয়া ফটোকার্ড ও মন্তব্যভিত্তিক। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁকে উদ্ধৃত করে ১০টি ভুয়া মন্তব্য ছড়ানো হয়েছে।

এ ছাড়া শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড ও ইনকিলাব মঞ্চ নিয়ে আটটি, জাইমা রহমানকে নিয়ে সাতটি এবং এনসিপির নেতা নাসীরউদ্দীন পাটওয়ারীকে নিয়ে পাঁচটি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে।